Skip to main content

গল্প - ‘দেখা হোলো’ - তাপসী ঘোষ(বেখেয়ালী)

Writer - Tapasi Ghosh
জীবনরথে জীবন পথে চলছি তো চলছি। ক্লান্ত আমি। ক্লান্ত মন। মন বিশ্রাম নিতে চায়। ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়লাম শিলংকে সামনে রেখে। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের সাথে অবশ্যই রইল ডাইরি পেন। ভার মনে বহুদিন লেখা থেকে বিরত। যদি প্রকৃতির কোলে বসে কোনো গল্প মনে আসে! ধরে রাখতে চাই কল্পনাকে ডাইরিতে।
- আপনাকে ভীষণ চেনা লাগছে! দেখেছি কোথাও।
কামরূপ এক্সপ্রেসে আমি এখন। গৌহাটী হয়ে শিলং যাবো। এই প্রথম একা কোথাও বেরিয়ে পড়া। বেশ লাগছে। খুশি মনে ডাইরি পেন হাতে আমার। ভাবছি কি লিখি কি লিখি! এমন সময়ে ঐ উক্তি কানে এলো। মুখোমুখি সিট্, ভদ্রোলোক এবং আমি। উনি কথাগুলো বলছেন আমাকে উদ্দেশ্য করে।
বেশির ভাগ পুরুষেরাই অচেনা মহিলার সঙ্গে আলাপের পথ খোঁজে এমনই কথায়। আমি বিরক্ত। বললাম - স্টেশন থেকেই নজরে রেখেছেন। চেনাতো মনে হবেই।  উচ্চহাস্যে নির্লজ্জের মতো বলে বসলেন - নজরে রাখার জিনিস তাইতো নজরে ছিল।
বিব্রত আমি। ট্রেনের কামরায় আরো মানুষ আছেন, শুধু উনি আর আমি তো  নই! তাই প্রশ্রয়ের বদলে চোখে মুখে বিরক্তি ফুটিয়ে বললাম - একজন অচেনা মহিলাকে এইভাবে বলাটা ঠিক নয়।
আশ্চর্য! আমার বিরক্তিতে কোনো হেলদোল নেই তাঁর! আবারও বলে বসলেন, কি করবো নজরে এলেন যে! তাইতো সবার থেকে আলাদা করে আপ.......
- আপনি বিবাহিত? কথা শেষ করতে না দিয়েই জিজ্ঞাসা আমার।
- বিবাহিত এবং এক ছেলের বাবাও আমি।
- বুঝেছি, একঘেয়ে জীবন। তাই অন্যের বৌ নজরে পড়ছে।
অবাক কাণ্ড! অপমানকর কথায় কান না দিয়ে এক মুখ হাসি ছড়িয়ে বললেন, আপনাকে দেখেছি আগে। কোথাও দেখা হয়েছিল আমাদের। হয়তো......, না থাক। আবার দেখা হলে বলবো তখন।
মনে মনে ‘আধপাগল’ গালি দিয়ে বাকি রাস্তা লোকটাকে এড়ালাম। তবে ভদ্রলোকও আর বিরক্ত করলেন না আমাকে।
সাতদিনের ট্যুর আমার। তিনদিন কেটে গেল শিলংএর এদিক সেদিক দেখতে। এসেছিলাম একা কিন্তু হোটেলে পাশের রুমের এক দম্পতীর সঙ্গে আলাপ হয়ে গেল। ঘুরছি আমরা এখন দল বেঁধেই। ভালোই লাগছে। তবে আজ আমি একটু নিজের মতো করে শিলং এর প্রকৃতিকে অনুভব করতে চাই। তাই বেরিয়ে পড়েছি তিনদিনের চেনা পথ ধরে। একটু আগেই বৃষ্টি হয়েছে। গাছের পাতায় টুপটুপ বৃষ্টির ফোঁটা। তাতে মিঠে রোদের ঝলকানি। কিছু পাহাড়ী চড়ুইএর নাচানাচি এ’ডাল ও’ডালে। প্রকৃতির কি অপরূপ শোভা! কবিতা আসছে মনে। কিন্তু ডাইরি পেন সাথে নেই। রবি’র কবিতাই ভরসা। আবৃত্তিতে মাতলাম,
জানিগো দিন যাবে, এ’দিন যাবে।
একদা কোন বেলাশেষে মলিন রবি করুণ হেসে
শেষ বিদায়ের চাওয়া আমার মুখের পানে চাবে।
পথের ধারে বাজবে......
থামতে হোলো। প্রকৃতির প্রেমে বিভোর আমি, রবি’র কবিতায় মত্ত আমি, এই নির্জন পথে আর পথচারীর হঠাৎ আগমনে থমকে আমায় থামতে হোলো।
- আবার দেখা হোলো।
নিজের আনন্দে বাধা পড়তে অসন্তুষ্ট। বেজার মুখে বললাম - তাইতো দেখছি।
- কেন আপনি খুশি নন?
- না। কারণ আপনি অত্যন্ত গায়ে পড়া।
- ঠিক তা নয়, আসলে নিজের স্বার্থেই আপনার পিছু পিছু।
চোখ কপালে আমার - মানে?
- শান্তিনিকেতনে অনন্যার সঙ্গে আজও দেখা হয়নি আবীরের। লেখিকা তাঁর কলমকে ‘আবার দেখা হবে’ এইখানেই থামিয়ে রেখেছেন!
আমার মাথা গুলিয়ে যাচ্ছে। হাঁ করে তাকিয়ে ভদ্রলোকের পানে।
- আমি আবীর বোস। পাঁচফুট আটইঞ্চি হাইট। চোখ আমার কথা বলে। আবীরের এমন চোখে চোখ রেখেই অনন্যা নিজেকে হারিয়েছিল। আপনার ‘আবার দেখা হবে’ গল্পটা আমি পড়েছি। “অনন্যা-আবীরের ভালোবাসার কাহিনী”।
আবীর বোস এক কাল্পনিক চরিত্র। কিন্তু কি কাণ্ড বাস্তবেও এক আবীর বোস! আমি ভালো করে ভদ্রোলোকের দিকে নজর করলাম। মন অবাক, তাইতো! গল্পের আবীর বোস আর এই আবীর বোস যেন এক। কিন্তু কল্পনা আর বাস্তব মেলে কি করে? এমনও হয়! তবে কি আমার রচিত কাহিনী মিলেছে কারো বাস্তব জীবনের এক খণ্ড কাহিনীতে? আবীর বোস যদি মিলে যায়, অনন্যাও তবে আছে কোথাও।
প্রশ্ন করে বসলাম, অনন্যা বলে কি কেউ কখনও এসেছে আপনার জীবনে?
উচ্চ হাস্যে নির্জন রাস্তা নির্জনতা হারালো। প্রকৃতির পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। ধমকে উঠলাম - আঃ এতো হাসেন কেন? প্রশ্নের উত্তর দিন।
- আমি সৈনিক। কঠোর জীবন, কঠিন প্রাণ। ভালোবাসা বুঝিনা। তাই কোনো অনন্যাই আমার জীবনে আসেনি। তবে আপনার গল্পটা ভালো লেগেছিল। ভালোবাসা এমনও হয়? অপেক্ষায় ছিলাম কবে আপনি আবীর-অনন্যার শান্তিনিকেতনের দোল উৎসবের গল্পটা লিখবেন। কেন লিখলেন না লেখিকা?
- হয়তো আবীর হারিয়েছে অনন্যা থেকে। তাই মনে হয় লেখা হোলোনা, মৃদু হেসে বললাম।
- আপনার ভাবনায় ভুলও তো হতে পারে। হয়তো আবীর অপেক্ষায় অনন্যার।
- আপনার এমন ভাবনা কেন?
- শিলং আপনার কেমন লাগছে? দেখছি একাই বেরিয়ে পড়েছেন। সাহসী নারী। হা হা হা...
ভদ্রলোক আমার প্রশ্ন এড়ালেন। আমিও তাঁর প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে বললাম, পাহাড়ী পথ। অচেনা পরিবেশ। অনেকটা এগিয়েও এসেছি। এবার ফিরবো। আসি......
- এগিয়ে দিই?
- দরকার হবে না। আমি ফেরার পথে পা বাড়ালাম।
- লেখিকা, শেষ কথা আমার, শুনবেন একটু?
থমকে দাঁড়ালাম। জিজ্ঞাসার চোখ আমার।
- ‘আবার দেখা হোলো’ লেখা হোক প্রথম কাহিনীর দ্বিতীয় পর্ব। হতেই তো পারে? যদি হয় তবে অনুরোধ, অনন্যার জন্য আবীরের মুখে এই কথাগুলো একটু বসিয়ে দেবেন,
“তোমারেই যেন ভালোবেসেছি
বারে বারে মনে হয়, তোমাকেই চেয়েছি।”
কথা কটা বলেই আবীর বোস তাঁর পথে এগিয়ে গেলেন। হতভম্ব আমি মানুষটার চলার পথে তাকিয়ে রইলাম।
দিন যাবে, এ’দিন যাবে। তবু মনে প্রশ্ন থাকবেই, “সত্যিই কি আমার কল্পকাহিনী মিলেছে এই আবীরের জীবনেরই কোনো খণ্ড কাহিনীতে?”

Comments

Popular posts from this blog

বোকা দিবসের শুভেচ্ছা - Champa Sader

চালাকি করেই জীবন গেল চালাকি করেই চলছো বেশ চালাকি দিয়েই আগামী যাবে রোজনামচায় দশের দেশ। আমিই কেবল বোকার হদ্দ বোকামিতেই দিন কাটাই, স্বপ্ন দেখেই হাসছি কেবল তারা গুনে রাত ছাটাই। চালাকিটা থাক তোমাদের এদিক সেদিক কথার ভাঁজ, সময় বদল মুখোশ পরে সুযোগ বুঝে বদল সাজ। বোকার মতো হয়েছি খুশি বোকার মতো দিয়েছি তাল, কেন যেন আজও বুঝিনা কোনটা মেকি কোনটা জাল! চালাকি থাক রক্তে তোমার বিজয়ী হও জীবন খেলায়, বোকা হয়েই থাকবো আমি দেখা হবে ভবের মেলায়।

সমকাল কোলাজ ( তৃতীয় সংখ্যা )

  সম্পূর্ণ ম্যাগাজিনটি পড়তে ক্লিক করুন নিচের লিঙ্কে -  সমকাল কোলাজ এপ্রিল সংখ্যা ২০২১

বিষয় - পুজোর প্রেম। গল্প - অল্প প্রেমের গল্প , কলমে - চম্পা সর্দার

জয়াদেবী ফোনটা হাতে নিয়ে উদাস হয়ে বসে ছিলেন বারান্দায়। মনে পড়ছিল- সাগর, ঝিনুক তখন কত ছোট... মা, এবার কিন্তু আমাকে পুজোতে একটা পুলিশের ড্রেস কিনে দেবে, আর একটা বন্দুক। দশ রিল ক্যাপ চাই আমার। রোজ রোদে দেবো, দেখবে কেমন ফাটে। নাড়ু বানানোর জন্য নারকেলে পাক দিতে দিতে জয়া বলে- সাগরের চাহিদা তো শুনলাম এবার তোর কি চাই ঝিনুক? আমার একটা গোলাপি রঙের ফেয়ারি ড্রেস। গোলাপি হেয়ারব্যান্ডও চাই, তিনটে ফুল লাগানো। তা তোমার কি চাই জয়া? বাজারের ব্যাগটা রান্না ঘরের এক কোণে নামিয়ে রাখেন সুব্রত বাবু। আরে, আরে তোমার কি কোনো দিন বুদ্ধি হবে না! একশো দিন বলেছি, বাজার করে ব্যাগ রান্না ঘরে ঢোকাবে না! চেঁচিয়ে ওঠে জয়া। দেখলি সাগর, দেখলি ঝিনুক তোদের মা কেমন সারাক্ষন আমায় বকতে থাকে। তোদের সাথে সাথে আমারও নিস্তার নেই তোদের মায়ের কাছ থেকে। সেবারের পুজোতে ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে ছবি তোলা হয়েছিল স্টুডিওতে। একটা ছবিতে পুলিশের ড্রেস পরে সাগর আর পরীর মতো সাজে ঝিনুক। আর একটা ছবিতে জয়া, সুব্রতর সাথে সাগর, ঝিনুক। ফ্যামিলি ফটো। ফোন গ্যালারিতে ছবিগুলো দেখতে দেখতে চোখটা ঝাপসা হয়ে আসে ষাটোর্ধ্ব জয়ার। এলবাম থেকে ফোনে ছবি ত...