জয়াদেবী ফোনটা হাতে নিয়ে উদাস হয়ে বসে ছিলেন বারান্দায়। মনে পড়ছিল- সাগর, ঝিনুক তখন কত ছোট...
মা, এবার কিন্তু আমাকে পুজোতে একটা পুলিশের ড্রেস কিনে দেবে, আর একটা বন্দুক। দশ রিল ক্যাপ চাই আমার। রোজ রোদে দেবো, দেখবে কেমন ফাটে।
নাড়ু বানানোর জন্য নারকেলে পাক দিতে দিতে জয়া বলে-
সাগরের চাহিদা তো শুনলাম এবার তোর কি চাই ঝিনুক?
আমার একটা গোলাপি রঙের ফেয়ারি ড্রেস। গোলাপি হেয়ারব্যান্ডও চাই, তিনটে ফুল লাগানো।
তা তোমার কি চাই জয়া? বাজারের ব্যাগটা রান্না ঘরের এক কোণে নামিয়ে রাখেন সুব্রত বাবু।
আরে, আরে তোমার কি কোনো দিন বুদ্ধি হবে না!
একশো দিন বলেছি, বাজার করে ব্যাগ রান্না ঘরে ঢোকাবে না! চেঁচিয়ে ওঠে জয়া।
দেখলি সাগর, দেখলি ঝিনুক তোদের মা কেমন সারাক্ষন আমায় বকতে থাকে। তোদের সাথে সাথে আমারও নিস্তার নেই তোদের মায়ের কাছ থেকে।
সেবারের পুজোতে ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে ছবি তোলা হয়েছিল স্টুডিওতে। একটা ছবিতে পুলিশের ড্রেস পরে সাগর আর পরীর মতো সাজে ঝিনুক। আর একটা ছবিতে জয়া, সুব্রতর সাথে সাগর, ঝিনুক। ফ্যামিলি ফটো।
ফোন গ্যালারিতে ছবিগুলো দেখতে দেখতে চোখটা ঝাপসা হয়ে আসে ষাটোর্ধ্ব জয়ার। এলবাম থেকে ফোনে ছবি তুলে রেখেছিল জয়া।
জয়া এভাবে বসে থেকে কি লাভ বলতো? ওরা সবাই ভালো আছে এটাই আমাদের শান্তি।আমাদের যে একসাথে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছে এটাই আমাদের পরম পাওনা। মা দুর্গার আশীর্বাদে ওরা সারাজীবন সুখে থাক। পুজোতে বাড়িতে ওদের কত বন্ধু বান্ধব আসে, আমরা ওখানে বেমানান। এখানে তো ভালোই আছি আমরা। ধীরে ধীরে কথাগুলো বলে চলেন সুব্রত বাবু।
চলো আজ আমরা একা একটু ঘুরে আসি। আজ দশমী। মনে আছে তোমার, আগে পুজোর চারদিনই বেরোতে হতো ওদের আবদারে। কত বছর হয়ে গেল...
কাপড়ের আঁচলটা চেপে ধরেন চোখে জয়াদেবী।
জয়া, ও জয়া...
বলি কি আজ সকালেই চলো বেরোই। এদিক সেদিক একটু ঘুরে দুপুরে বাইরেই খেয়ে নেবো কিছু। এবার যে লাল পাড়ের সাদা তাঁতের শাড়িটা কিনে দিলাম সেটা পরো।
কখন যে মা আসেন, কখন যে তাঁর ফেরার সময় এসে যায় কিছুই বুঝতে পারেন না এই দুই বৃদ্ধ দম্পতি। ছেলে মেয়েকে বড় করা, ওদের চাকরি, ওদের বিয়ে দিতেই কখন যে এত্তগুলো বছর পেরিয়ে গেছে, নিজেদের দিকে ফিরে তাকানোর সময়ও পাননি তাঁরা।
একটা রিকশা নিয়ে চারটে প্যান্ডেলে ঠাকুর দেখে, একটা সস্তার হোটেলে স্ত্রীকে নিয়ে ঢোকেন সুব্রত বাবু।
বাবা, এদিকে এসো তো-
মোচার ঘন্ট, দুটো সর্ষে ইলিশ আর এক প্লেট পাঁঠার মাংস দিও। হোটেলের ছেলেটিকে খাবারের অর্ডার দিয়ে মুচকি হাসেন সুব্রত বাবু।
একটা কথা বলবো তোমাকে? তোমার বেশ কয়েকটা দাঁত পড়ে গেছে কিন্তু তোমার হাসিটা এখনো একই রকম আছে জানো।
জয়ার কথায় একটু চমকে গিয়ে হা হা করে হেসে ওঠেন সুব্রত। তুমি আমার হাসি লক্ষ্য করেছো কোনোদিন, এটা তো জানতাম না! তা এই লুকিয়ে লুকিয়ে দেখার অভ্যেসটা কবে থেকে হয়েছিল শুনি?
তুমি না একটা যা তা ! এত লোকের মধ্যে কি যে বলো না! লজ্জা পেয়ে যায় জয়া।
জয়া... তোমার লজ্জাটাও তো এখনো একই রকম রয়েছে। মনে আছে যেদিন তোমায় দেখতে গেছিলাম সেদিনও ঠিক এই রকমই লজ্জা লজ্জা মুখ করে বসে ছিলে। আর ফুলশয্যার দিন...
বাবু, আপনাদের খাবার..
হোটেল বয়ের কথায় চুপ করে যান সুব্রত বাবু।
বিকেলের দিকে গঙ্গার ধারে এসে বসেন দুজন। ভাসান দেখবেন বলে। একে একে মায়ের ভাসান চলতে থাকে।
জয়া তুমি একটু বসো আমি আসছি, বলে মিনিট দশেক পরেই ফিরে আসেন সুব্রত।
পেছন ফেরো দেখি, আহ, বলছি একটু পেছন ফেরো। কিছুটা কাঁপা কাঁপা হাতেই একটা জুঁই ফুলের মালা জড়িয়ে দেয় জয়ার খোঁপায়।
সাদা চুলে সাদা মালাটায় কিন্তু বেশ লাগছে তোমায় জয়া। বুড়ি হয়ে গিয়ে এখন যেন একটু বেশি সুন্দরী হয়ে গেছো। নিজের রসিকতায় নিজেই হেসে ওঠেন সুব্রত বাবু।
বুঝলাম, বুড়ো বয়সে প্রেমটা তোমার একটু বেশি বেড়েছে! তা আর কিছু বাকি আছে নাকি! কপট রাগ দেখান জয়াদেবী।
পাঞ্জাবির পকেট থেকে সিঁদুরের কৌটো বার করে জয়ার সিঁথি রাঙিয়ে দিয়ে দুগালে বুলিয়ে দেন সিঁদুর।
শুভ বিজয়া জয়া...
জয়া দেবী স্বামীর পায়ে প্রণাম করে বলেন-
এই সিঁদুর মাথায় নিয়েই যেন আমি শেষ যাত্রায় যেতে পারি গো।
একে একে দেবীর ভাসান হয়ে চলেছে গঙ্গার বুকে... সূর্য তখন পশ্চিম আকাশ রাঙিয়ে ম্লান মুখে বিদায় বেলায়।
আর সমস্বরে চিৎকার ভেসে আসছে-
" বলো দুর্গা মাই কি... জয়...
আসছে বছর... আবার হবে..."
©দলছুট পাখি
@champa sarder
মা, এবার কিন্তু আমাকে পুজোতে একটা পুলিশের ড্রেস কিনে দেবে, আর একটা বন্দুক। দশ রিল ক্যাপ চাই আমার। রোজ রোদে দেবো, দেখবে কেমন ফাটে।
নাড়ু বানানোর জন্য নারকেলে পাক দিতে দিতে জয়া বলে-
সাগরের চাহিদা তো শুনলাম এবার তোর কি চাই ঝিনুক?
আমার একটা গোলাপি রঙের ফেয়ারি ড্রেস। গোলাপি হেয়ারব্যান্ডও চাই, তিনটে ফুল লাগানো।
তা তোমার কি চাই জয়া? বাজারের ব্যাগটা রান্না ঘরের এক কোণে নামিয়ে রাখেন সুব্রত বাবু।
আরে, আরে তোমার কি কোনো দিন বুদ্ধি হবে না!
একশো দিন বলেছি, বাজার করে ব্যাগ রান্না ঘরে ঢোকাবে না! চেঁচিয়ে ওঠে জয়া।
দেখলি সাগর, দেখলি ঝিনুক তোদের মা কেমন সারাক্ষন আমায় বকতে থাকে। তোদের সাথে সাথে আমারও নিস্তার নেই তোদের মায়ের কাছ থেকে।
সেবারের পুজোতে ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে ছবি তোলা হয়েছিল স্টুডিওতে। একটা ছবিতে পুলিশের ড্রেস পরে সাগর আর পরীর মতো সাজে ঝিনুক। আর একটা ছবিতে জয়া, সুব্রতর সাথে সাগর, ঝিনুক। ফ্যামিলি ফটো।
ফোন গ্যালারিতে ছবিগুলো দেখতে দেখতে চোখটা ঝাপসা হয়ে আসে ষাটোর্ধ্ব জয়ার। এলবাম থেকে ফোনে ছবি তুলে রেখেছিল জয়া।
জয়া এভাবে বসে থেকে কি লাভ বলতো? ওরা সবাই ভালো আছে এটাই আমাদের শান্তি।আমাদের যে একসাথে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছে এটাই আমাদের পরম পাওনা। মা দুর্গার আশীর্বাদে ওরা সারাজীবন সুখে থাক। পুজোতে বাড়িতে ওদের কত বন্ধু বান্ধব আসে, আমরা ওখানে বেমানান। এখানে তো ভালোই আছি আমরা। ধীরে ধীরে কথাগুলো বলে চলেন সুব্রত বাবু।
চলো আজ আমরা একা একটু ঘুরে আসি। আজ দশমী। মনে আছে তোমার, আগে পুজোর চারদিনই বেরোতে হতো ওদের আবদারে। কত বছর হয়ে গেল...
কাপড়ের আঁচলটা চেপে ধরেন চোখে জয়াদেবী।
জয়া, ও জয়া...
বলি কি আজ সকালেই চলো বেরোই। এদিক সেদিক একটু ঘুরে দুপুরে বাইরেই খেয়ে নেবো কিছু। এবার যে লাল পাড়ের সাদা তাঁতের শাড়িটা কিনে দিলাম সেটা পরো।
কখন যে মা আসেন, কখন যে তাঁর ফেরার সময় এসে যায় কিছুই বুঝতে পারেন না এই দুই বৃদ্ধ দম্পতি। ছেলে মেয়েকে বড় করা, ওদের চাকরি, ওদের বিয়ে দিতেই কখন যে এত্তগুলো বছর পেরিয়ে গেছে, নিজেদের দিকে ফিরে তাকানোর সময়ও পাননি তাঁরা।
একটা রিকশা নিয়ে চারটে প্যান্ডেলে ঠাকুর দেখে, একটা সস্তার হোটেলে স্ত্রীকে নিয়ে ঢোকেন সুব্রত বাবু।
বাবা, এদিকে এসো তো-
মোচার ঘন্ট, দুটো সর্ষে ইলিশ আর এক প্লেট পাঁঠার মাংস দিও। হোটেলের ছেলেটিকে খাবারের অর্ডার দিয়ে মুচকি হাসেন সুব্রত বাবু।
একটা কথা বলবো তোমাকে? তোমার বেশ কয়েকটা দাঁত পড়ে গেছে কিন্তু তোমার হাসিটা এখনো একই রকম আছে জানো।
জয়ার কথায় একটু চমকে গিয়ে হা হা করে হেসে ওঠেন সুব্রত। তুমি আমার হাসি লক্ষ্য করেছো কোনোদিন, এটা তো জানতাম না! তা এই লুকিয়ে লুকিয়ে দেখার অভ্যেসটা কবে থেকে হয়েছিল শুনি?
তুমি না একটা যা তা ! এত লোকের মধ্যে কি যে বলো না! লজ্জা পেয়ে যায় জয়া।
জয়া... তোমার লজ্জাটাও তো এখনো একই রকম রয়েছে। মনে আছে যেদিন তোমায় দেখতে গেছিলাম সেদিনও ঠিক এই রকমই লজ্জা লজ্জা মুখ করে বসে ছিলে। আর ফুলশয্যার দিন...
বাবু, আপনাদের খাবার..
হোটেল বয়ের কথায় চুপ করে যান সুব্রত বাবু।
বিকেলের দিকে গঙ্গার ধারে এসে বসেন দুজন। ভাসান দেখবেন বলে। একে একে মায়ের ভাসান চলতে থাকে।
জয়া তুমি একটু বসো আমি আসছি, বলে মিনিট দশেক পরেই ফিরে আসেন সুব্রত।
পেছন ফেরো দেখি, আহ, বলছি একটু পেছন ফেরো। কিছুটা কাঁপা কাঁপা হাতেই একটা জুঁই ফুলের মালা জড়িয়ে দেয় জয়ার খোঁপায়।
সাদা চুলে সাদা মালাটায় কিন্তু বেশ লাগছে তোমায় জয়া। বুড়ি হয়ে গিয়ে এখন যেন একটু বেশি সুন্দরী হয়ে গেছো। নিজের রসিকতায় নিজেই হেসে ওঠেন সুব্রত বাবু।
বুঝলাম, বুড়ো বয়সে প্রেমটা তোমার একটু বেশি বেড়েছে! তা আর কিছু বাকি আছে নাকি! কপট রাগ দেখান জয়াদেবী।
পাঞ্জাবির পকেট থেকে সিঁদুরের কৌটো বার করে জয়ার সিঁথি রাঙিয়ে দিয়ে দুগালে বুলিয়ে দেন সিঁদুর।
শুভ বিজয়া জয়া...
জয়া দেবী স্বামীর পায়ে প্রণাম করে বলেন-
এই সিঁদুর মাথায় নিয়েই যেন আমি শেষ যাত্রায় যেতে পারি গো।
একে একে দেবীর ভাসান হয়ে চলেছে গঙ্গার বুকে... সূর্য তখন পশ্চিম আকাশ রাঙিয়ে ম্লান মুখে বিদায় বেলায়।
আর সমস্বরে চিৎকার ভেসে আসছে-
" বলো দুর্গা মাই কি... জয়...
আসছে বছর... আবার হবে..."
©দলছুট পাখি
@champa sarder
Comments
Post a Comment