-এই আস্তে আস্তে, আর একটু নীচু কর...
-আরে গেটের মাথায় যেন না ঠেকে।
- ও রুনু দা একটু একটু বাদিকে।
উফফ কাজের সময় এতবার কে ফোন করছে! যতদিন ফোন ছিল না ভালো ছিল।
কথাগুলো ভাবতে ভাবতে বা দিকটা সামলে নেয় রুনু।
দশ জন জোয়ান বাহকের কাঁধে চেপে দশভুজা প্রবেশ করেন মণ্ডপে। আজ পঞ্চমী, বেশ কয়েকটা প্যান্ডেলেই পৌঁছে দিতে হবে জগৎজননীকে।
মিত্রপাড়ার মণ্ডপে ঠাকুর নামিয়ে দশটা ঘর্মাক্ত শরীর একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। প্যান্ডেলের বাইরে একটু জিরিয়ে নেবার জন্য বসে পরে বেল গাছটার পাশেই। কাল সকালে ষষ্ঠী পুজো হবে এখানেই।
বেশ বিরক্তির সঙ্গে রুনু বলে-
- দেখো হয়েছে এক ফোন। পুজো কর্তারা সব ঠাকুরের সঙ্গে সেলফি তুলতেই ব্যস্ত। কোথায় আমাদের টাকাটা মিটিয়ে ছেড়ে দেবে, তা না!
এই রফিক যা না, গিয়ে বল না আমাদের ছেড়ে দিতে।
পটা দা বাড়ি যাবে কবে তুমি?
পটা একটা বিড়ি ধরিয়ে দীর্ঘ ধোঁয়া ছাড়ে...
- যাবো রে রুনু। ছেলে মেয়েদের নতুন জামা কিনে দিতে পারিনি এখনো। কাজ কয়েকটা শেষ করেই ভাবছি কালই ট্রেন ধরবো।
- সে তো ঠিকই। বছরে এই সময়টাতেই তো একটু যা ঠিক মতো রোজগার। নয়তো মাটি কাটা, রাজমিস্ত্রীর জোগারের কাজে কি আর ইনকাম বল!
-দাদা, সেক্রেটারি পাঁচশো টাকা কম দিল।
কথাটা শুনেই রাগে ফুঁসে ওঠে রুনু। পাথর কোঁদা চেহারাটা অসুরের মতো ফুলিয়ে উঠে দাঁড়ায়।
- কম দিলেই হবে নাকি? দাঁড়া আমি যাচ্ছি। মায়ের শরীরটা ভালো নেই দেখে এসেছি। কাল ডাক্তার দেখাতেই হবে। টাকা কম বললে চলবে নাকি?
অনেক বাকবিতন্ডার পর কড়ায় গন্ডায় হিসেব বুঝে নিয়ে প্যান্ডেলে ঢুকে দুর্গা মাকে প্রণাম করে বেরিয়ে এসে, বাহক দলের মধ্যে টাকাটা ভাগ করে দেয় রুনু।এর মধ্যে আরোও কয়েকবার ফোনটা বেজে গেছে।কুমোরবাড়ি থেকে ঠাকুর নিয়ে এবার যেতে হবে নবারুণ সংঘের মাঠে। ঠাকুর বওয়ার বাঁশ কাঁধে তুলে হাঁটতে হাঁটতে ফোনটা হাফ প্যান্টের পকেট থেকে বার করে দেখে বাড়ি থেকেই ফোন এসেছে এতবার।
কল ব্যাক করে কিছু কথা হ্যাঁ না তেই জবাব দিতে থাকে সে। থমথমে মুখে ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে রাখে।
- কি হলো রুনু? জলদি পা চালা।
- আমাকে বাড়ি যেতে হবে দুলাল দা।
- এখন বাড়ি যেতে হবে বললে কি করে হবে? আরও দুটো প্যান্ডেলে ঠাকুর পৌঁছাতে হবে।
- তোমরা তো ন'জন রইলে। ন'টা কাঁধ দুর্গা মায়ের জন্য যথেষ্ট, কিন্তু আমার কাঁধটার যে অন্য একজনের আজ বিশেষ প্রয়োজন।
কথাটা বলেই ডান হাতের চেটো দিয়ে চোখ মোছে রুনু।
- কি হয়েছে রুনু দা? জিজ্ঞাসা করে রফিক।
- মা আর নেই। যাবার আগে আমাকেই খুঁজছিল আর জল চাইছিল...
দাঁড়িয়ে পরে সকলে।
- কাঁধের বাঁশটা নামা রুনু। রফিক তুই যা রুনুর সাথে। বাকি কাজগুলো আমরা আটজনেই করে নিতে পারবো। কাজগুলো শেষ করেই যাচ্ছি তোর কাছে।
- দুলাল দা তোমাকেও যে কালই বাড়ি ফিরতে হবে।
- তোকে সেসব ভাবতে হবে না। তুই সাবধানে যা, রফিক, রুনুকে সাবধানে নিয়ে যা।
ভোরবেলা কাজ শেষ করে সকলেই পৌঁছায় রুনুর মানিকতলার বস্তিতে। রুনু, রফিক, দুলাল, পটার কাঁধে চেপে রুনুর মা পৌঁছে যায় নিজের মন্দিরে। যেখানে গেলে মানুষ ভগবান হয়ে যায়। যেখানে গেলে নিত্য পুজো পাওয়া যায়, সময়ে জল পাওয়া যায়...
-আস্তে আস্তে নামা, দেখিস যেন ফুলগুলো পরে না যায়।
- সব ফুল, কাপড় খুলে দে রে...
- ধীরে ধীরে ঢোকা বডিটা...
একরাশ ধোঁয়া কুন্ডলী পাকিয়ে উঠতে থাকে উপরে। একদৃষ্টে রুনু তাকিয়ে দেখে মায়ের বিসর্জন। কাছেই কোনো প্যান্ডেলের মাইকে বেজে ওঠে ষষ্ঠীর দুর্গা বোধনের মন্ত্র।
মা তবে এসেই গেলেন...
©দলছুট পাখি
@champa sarder
-আরে গেটের মাথায় যেন না ঠেকে।
- ও রুনু দা একটু একটু বাদিকে।
উফফ কাজের সময় এতবার কে ফোন করছে! যতদিন ফোন ছিল না ভালো ছিল।
কথাগুলো ভাবতে ভাবতে বা দিকটা সামলে নেয় রুনু।
দশ জন জোয়ান বাহকের কাঁধে চেপে দশভুজা প্রবেশ করেন মণ্ডপে। আজ পঞ্চমী, বেশ কয়েকটা প্যান্ডেলেই পৌঁছে দিতে হবে জগৎজননীকে।
মিত্রপাড়ার মণ্ডপে ঠাকুর নামিয়ে দশটা ঘর্মাক্ত শরীর একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। প্যান্ডেলের বাইরে একটু জিরিয়ে নেবার জন্য বসে পরে বেল গাছটার পাশেই। কাল সকালে ষষ্ঠী পুজো হবে এখানেই।
বেশ বিরক্তির সঙ্গে রুনু বলে-
- দেখো হয়েছে এক ফোন। পুজো কর্তারা সব ঠাকুরের সঙ্গে সেলফি তুলতেই ব্যস্ত। কোথায় আমাদের টাকাটা মিটিয়ে ছেড়ে দেবে, তা না!
এই রফিক যা না, গিয়ে বল না আমাদের ছেড়ে দিতে।
পটা দা বাড়ি যাবে কবে তুমি?
পটা একটা বিড়ি ধরিয়ে দীর্ঘ ধোঁয়া ছাড়ে...
- যাবো রে রুনু। ছেলে মেয়েদের নতুন জামা কিনে দিতে পারিনি এখনো। কাজ কয়েকটা শেষ করেই ভাবছি কালই ট্রেন ধরবো।
- সে তো ঠিকই। বছরে এই সময়টাতেই তো একটু যা ঠিক মতো রোজগার। নয়তো মাটি কাটা, রাজমিস্ত্রীর জোগারের কাজে কি আর ইনকাম বল!
-দাদা, সেক্রেটারি পাঁচশো টাকা কম দিল।
কথাটা শুনেই রাগে ফুঁসে ওঠে রুনু। পাথর কোঁদা চেহারাটা অসুরের মতো ফুলিয়ে উঠে দাঁড়ায়।
- কম দিলেই হবে নাকি? দাঁড়া আমি যাচ্ছি। মায়ের শরীরটা ভালো নেই দেখে এসেছি। কাল ডাক্তার দেখাতেই হবে। টাকা কম বললে চলবে নাকি?
অনেক বাকবিতন্ডার পর কড়ায় গন্ডায় হিসেব বুঝে নিয়ে প্যান্ডেলে ঢুকে দুর্গা মাকে প্রণাম করে বেরিয়ে এসে, বাহক দলের মধ্যে টাকাটা ভাগ করে দেয় রুনু।এর মধ্যে আরোও কয়েকবার ফোনটা বেজে গেছে।কুমোরবাড়ি থেকে ঠাকুর নিয়ে এবার যেতে হবে নবারুণ সংঘের মাঠে। ঠাকুর বওয়ার বাঁশ কাঁধে তুলে হাঁটতে হাঁটতে ফোনটা হাফ প্যান্টের পকেট থেকে বার করে দেখে বাড়ি থেকেই ফোন এসেছে এতবার।
কল ব্যাক করে কিছু কথা হ্যাঁ না তেই জবাব দিতে থাকে সে। থমথমে মুখে ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে রাখে।
- কি হলো রুনু? জলদি পা চালা।
- আমাকে বাড়ি যেতে হবে দুলাল দা।
- এখন বাড়ি যেতে হবে বললে কি করে হবে? আরও দুটো প্যান্ডেলে ঠাকুর পৌঁছাতে হবে।
- তোমরা তো ন'জন রইলে। ন'টা কাঁধ দুর্গা মায়ের জন্য যথেষ্ট, কিন্তু আমার কাঁধটার যে অন্য একজনের আজ বিশেষ প্রয়োজন।
কথাটা বলেই ডান হাতের চেটো দিয়ে চোখ মোছে রুনু।
- কি হয়েছে রুনু দা? জিজ্ঞাসা করে রফিক।
- মা আর নেই। যাবার আগে আমাকেই খুঁজছিল আর জল চাইছিল...
দাঁড়িয়ে পরে সকলে।
- কাঁধের বাঁশটা নামা রুনু। রফিক তুই যা রুনুর সাথে। বাকি কাজগুলো আমরা আটজনেই করে নিতে পারবো। কাজগুলো শেষ করেই যাচ্ছি তোর কাছে।
- দুলাল দা তোমাকেও যে কালই বাড়ি ফিরতে হবে।
- তোকে সেসব ভাবতে হবে না। তুই সাবধানে যা, রফিক, রুনুকে সাবধানে নিয়ে যা।
ভোরবেলা কাজ শেষ করে সকলেই পৌঁছায় রুনুর মানিকতলার বস্তিতে। রুনু, রফিক, দুলাল, পটার কাঁধে চেপে রুনুর মা পৌঁছে যায় নিজের মন্দিরে। যেখানে গেলে মানুষ ভগবান হয়ে যায়। যেখানে গেলে নিত্য পুজো পাওয়া যায়, সময়ে জল পাওয়া যায়...
-আস্তে আস্তে নামা, দেখিস যেন ফুলগুলো পরে না যায়।
- সব ফুল, কাপড় খুলে দে রে...
- ধীরে ধীরে ঢোকা বডিটা...
একরাশ ধোঁয়া কুন্ডলী পাকিয়ে উঠতে থাকে উপরে। একদৃষ্টে রুনু তাকিয়ে দেখে মায়ের বিসর্জন। কাছেই কোনো প্যান্ডেলের মাইকে বেজে ওঠে ষষ্ঠীর দুর্গা বোধনের মন্ত্র।
মা তবে এসেই গেলেন...
©দলছুট পাখি
@champa sarder

উফ ...দুর্দান্ত লেখনী ❤
ReplyDeleteOsadharon.
ReplyDeleteবেশ ভালো লাগলো
ReplyDeleteচমৎকার
ReplyDeleteঅপূর্ব। ভেতরে একটা চাপা ধাক্কা অনুভব করলাম।
ReplyDelete