Skip to main content

গৌরীর বোধন - দলছুট পাখি ( মহা ষষ্ঠী স্পেশাল )

- ফির ম্যাঘ করছে! আইজ মাছ ধরতে বাইড়ান লাগবো না।
জিগাই, কতাডা কানে গ্যালো না কি?

- না রে পতিমা, এহন কতো ট্যাকা লাগবো বল দিকিনি? তুই ভরা মাসের পোয়াতি। কয়দিন পর ঘর আলো কইরা একখান চান্দ আইবো...

- হ, তা বইলা এই বাদলায় তোমারে আমি যাইতে দিমু না নদীতে। আমার শরীলডাও ভালো ঠেকতাছে না।

- তুই চুপ মাইরা শুইয়া থাক পতিমা, ঢিলা দে শরীলডা। বিন্দা পিসিরে কইয়া যাইতাছি রাইতে তর কাছেই শুইবো। কহন কি দরকার লাগে।

সুন্দরবনের খালবিলের জলা জীবন যাপনের এক দাম্পত্য জীবন প্রতিমা আর উমেশের। আট বছর পর সুখের মুখ দেখতে চলেছে ওরা। অনেক ঠাকুর দেবতা মানত করে প্রতিমার কোল ভরেছে, শুধু নতুন একটা সূর্য দেখার অপেক্ষা।

বিন্দা পিসিকে রাতে প্রতিমার কাছে শুতে বলে উমেশ চলে যায় ছোট ডিঙিখানা নিয়ে মাছ ধরতে। বিকেল থেকে টিপটিপ বৃষ্টি শুরু হয়েছে।
নদীতে যাওয়ার পথে মিত্তির বাড়ির দুর্গা দালানে দাঁড়িয়ে করজোড়ে প্রণাম জানায় উমেশ।

- ঠাকুর অনেক দয়া তোমার। আমাগো মাটির ঘরে হাসি আনছো। তুমি দেইখ্য পতিমারে। আইজ ষষ্ঠী, মা গো... একখান বাচ্চার মুখ দেখাও আমাগো। জয় মা...


-ও বউ... জিগাই অবেলায় অমন শুইয়া আছিস ক্যান। উমা কইয়া গ্যালো তর কাছে শুইতে। বিষ্টি পড়তাছে দেইখ্যা চইল্যা আইলাম অখনি।

- শরীলডায় জুইত নাই গো পিসি। কত্তবার কইলাম আইজ যাওন লাগবো না। তা কে শোনে কার কতা!

রাত বাড়তে থাকে, বৃষ্টি বাড়ে, মাতলার জলও বাড়ে...
অসহ্য পেটে যন্ত্রনা শুরু হয় প্রতিমার।

- ও মা গো... আর পারতাছি না... পিসি... ও পিসি...

মা ষষ্ঠী যে কার ভাগ্যে কি লেখেন তা একমাত্র তিনিই জানেন। প্রত্যন্ত পাড়া গাঁয়ে একদিকে ডাক্তারের অভাব, তার ওপর ঝড় বৃষ্টির দাপট।

- একটু চাপ দে বউ... আর একটু...

মাটির মেঝে রক্তে ভিজে ওঠে। প্রতিমা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে চোখ বুজলেও কোনো কচি স্বরের কান্নার আওয়াজ কানে আসে না। অসহায় বিন্দা পিসির দুহাতে তখন অমাবস্যার চাঁদ আর মাটির মেঝেতে অজ্ঞান প্রতিমা যেন প্রাণ প্রতিষ্ঠার অপেক্ষায়।

ঝড় বৃষ্টির জন্য আর নদীতে যাওয়া হয়নি উমেশের। ঘাটের ছাউনিতেই অপেক্ষা করে ভোরের দিকে একটু বৃষ্টি কমলে তাড়াতাড়ি পা চালায় বাড়ির দিকে।
ফিরতি পথে আর একবার মিত্তির বাড়ির দুর্গা দালানে প্রণাম করতে যায় উমেশ। চারিদিকে আবছা কুয়াশা, বেল গাছটার তলায় ষষ্ঠী পুজো হয়েছে আজ।
মিত্তিরেরা বর্তমানে কলকাতার বাসিন্দা হলেও পুজোর কটা দিন গ্রামেই কাটান। বড় বাড়ি পেরিয়ে কিছুটা মাঠের মতো জায়গা পেরিয়ে দুর্গা দালান।
গ্রামের লোকের অবাধ প্রবেশ সেখানে। দালানে প্রণাম করতে এসে উমেশ চমকে ওঠে!
প্রণাম সেরে খুব তাড়াতাড়ি দৌড়ে বের হয়ে যায় সেখান থেকে। হাতে জড়ানো কাপড়ের পুটলিটা নিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বাড়ি ঢোকে।

গল্পের গল্পকার কাকে কোন চরিত্র প্রদান করেন তা গল্পের কুশীলবেরা আগে থেকে কখনোই টের পায় না।

রক্তাক্ত মাটির মেঝে, প্রাণ প্রতিষ্ঠার অপেক্ষায় প্রতিমা, অমাবস্যার চাঁদ কোলে অসহায় বিন্দা পিসি। বর্তমান করণীয় সম্পর্কে উমেশ প্রস্তুত। সকাল হতে কিছুটা সময় বাকি। নিজের হাতে জড়ানো কাপড়ের পুটুলিটা বিন্দা পিসির কোলে দিয়ে, অমাবস্যার চাঁদকে ভাসিয়ে দিয়ে আসে ফুলে ওঠা মাতলার বুকে।

ঘরে ফিরে দেখে কচি ঠোঁট দুটো প্রাণপণে প্রতিমার দুকূল উথলে ওঠা জোয়ারে সাঁতার কাটছে।

- এতক্ষণে আইছো...দ্যাখো তোমার চান্দ...
ক্ষীণ গলায় কথাগুলো বলে প্রতিমা।

- পিসি তুমি আইজ না থাকলে ...
হু হু করে কেঁদে ফেলে উমেশ।

জয় মা, মা ষস্টি... ভালো রাইখ্য ওগো... আমি যাই রে বউ, বেলায় আমু নে। ভালো কইরা বুকের দুদ খাওয়াইস মাইয়াডারে। মা গো... মা... তুমিই জানো কারে কার লেইগ্যা পাঠাইছো...

উমেশের ঘরে প্রতিমার কোল আলো করে আজ গৌরীর বোধন...


©দলছুট পাখি
@champa sarder

Comments

Popular posts from this blog

বোকা দিবসের শুভেচ্ছা - Champa Sader

চালাকি করেই জীবন গেল চালাকি করেই চলছো বেশ চালাকি দিয়েই আগামী যাবে রোজনামচায় দশের দেশ। আমিই কেবল বোকার হদ্দ বোকামিতেই দিন কাটাই, স্বপ্ন দেখেই হাসছি কেবল তারা গুনে রাত ছাটাই। চালাকিটা থাক তোমাদের এদিক সেদিক কথার ভাঁজ, সময় বদল মুখোশ পরে সুযোগ বুঝে বদল সাজ। বোকার মতো হয়েছি খুশি বোকার মতো দিয়েছি তাল, কেন যেন আজও বুঝিনা কোনটা মেকি কোনটা জাল! চালাকি থাক রক্তে তোমার বিজয়ী হও জীবন খেলায়, বোকা হয়েই থাকবো আমি দেখা হবে ভবের মেলায়।

সমকাল কোলাজ ( তৃতীয় সংখ্যা )

  সম্পূর্ণ ম্যাগাজিনটি পড়তে ক্লিক করুন নিচের লিঙ্কে -  সমকাল কোলাজ এপ্রিল সংখ্যা ২০২১

বিষয় - পুজোর প্রেম। গল্প - অল্প প্রেমের গল্প , কলমে - চম্পা সর্দার

জয়াদেবী ফোনটা হাতে নিয়ে উদাস হয়ে বসে ছিলেন বারান্দায়। মনে পড়ছিল- সাগর, ঝিনুক তখন কত ছোট... মা, এবার কিন্তু আমাকে পুজোতে একটা পুলিশের ড্রেস কিনে দেবে, আর একটা বন্দুক। দশ রিল ক্যাপ চাই আমার। রোজ রোদে দেবো, দেখবে কেমন ফাটে। নাড়ু বানানোর জন্য নারকেলে পাক দিতে দিতে জয়া বলে- সাগরের চাহিদা তো শুনলাম এবার তোর কি চাই ঝিনুক? আমার একটা গোলাপি রঙের ফেয়ারি ড্রেস। গোলাপি হেয়ারব্যান্ডও চাই, তিনটে ফুল লাগানো। তা তোমার কি চাই জয়া? বাজারের ব্যাগটা রান্না ঘরের এক কোণে নামিয়ে রাখেন সুব্রত বাবু। আরে, আরে তোমার কি কোনো দিন বুদ্ধি হবে না! একশো দিন বলেছি, বাজার করে ব্যাগ রান্না ঘরে ঢোকাবে না! চেঁচিয়ে ওঠে জয়া। দেখলি সাগর, দেখলি ঝিনুক তোদের মা কেমন সারাক্ষন আমায় বকতে থাকে। তোদের সাথে সাথে আমারও নিস্তার নেই তোদের মায়ের কাছ থেকে। সেবারের পুজোতে ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে ছবি তোলা হয়েছিল স্টুডিওতে। একটা ছবিতে পুলিশের ড্রেস পরে সাগর আর পরীর মতো সাজে ঝিনুক। আর একটা ছবিতে জয়া, সুব্রতর সাথে সাগর, ঝিনুক। ফ্যামিলি ফটো। ফোন গ্যালারিতে ছবিগুলো দেখতে দেখতে চোখটা ঝাপসা হয়ে আসে ষাটোর্ধ্ব জয়ার। এলবাম থেকে ফোনে ছবি ত...