Skip to main content

কালরাত্রি - মহা সপ্তমী স্পেশ্যাল - কলমে - দলছুট পাখি ( চম্পা সর্দার )

কুলি কামিনের ঘরের মেয়ে, কাঠ কুড়িয়ে দিন যায় তার আবার এত অহংকার! মাতব্বরদের চোখে ভালো ঠেকে না সাঁঝলির রকমসকম।

কষ্টি পাথরে খোদাই করা নিটোল চেহারা, ছোট ছোট অথচ বুদ্ধিদীপ্ত দুটো চোখ, একঢাল কোঁকরানো চুলে শক্ত করে বিনুনি বাঁধা। গ্রামের কেন দূর গ্রামের যে কোন মানুষেরই চোখে পড়ে সাঁঝলির রূপ।

ইবার হুল পরবটোতে তু আর লাচবিক লাই সাঁঝলি।
 একটু জোর করেই ফুলমনি বলে কথাটা। পরবটোর পরেই তোর বিহা দিব বটে। আর কুতো দিন ওই খাতা বইটো লিয়ে ইসকুলে যাবি?

পলাশবনির জীবনযাত্রায় নতুন কিছু খুঁজে পায় না সাঁঝলি। স্বপ্ন দেখে, কলকাতার কলেজ... উঁচু বিল্ডিং... ঠান্ডা ঘর...টিভিতে দেখা, সুন্দর ব্যাগ কাঁধে অফিস...
উফফ, ভাবলেই যেন বারবার শিউরে ওঠে ও।

আমি বিহা কোরবোক লাই। মুরে দুটা ভাত দিতে তুগো এত্ত অসুবিধা হইনছে? ঠিক আছে আর আইসবক লাই তুদের ঘরটোতে।
বলে সাইকেলটা নিয়ে স্কুলে বেরিয়ে যায় সাঁঝলি।

সারাদিন মনমরা হয়ে ক্লাসে বসে থাকে। টিফিনেও কারোর সাথে কথা বলে না। এবছর মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী ও। খুব ভালো না হলেও মোটামুটি ভালোই রেজাল্ট করে আসছে এতদিন। সাড়ে চারটের ছুটির পর খুব ধীরে ধীরে সাইকেল নিয়ে বাড়ির পথেই রওনা হয় সে। রাগ তো দেখানো হয়েছে বাড়িতে, কিন্তু বাড়ি ছাড়া এখন যাবেই বা কোথায়! বাড়ি ফিরে না হয় মাকে বুঝিয়ে বলতে পারবে, আর বাপটা তো সন্ধ্যে হলেই মদ গিলে পরে থাকে। সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতেই ফিরছিল শাল সেগুনের পথ দিয়ে।
এই জঙ্গলে বিকেল গড়িয়েই রাত নামে, আর মাদলের ঢিমে তালে মহুয়া মন মাতায়...

-এই সাঁঝলি শুন...

ডাক শুনে পিছন ফিরে দেখে শ্যামল বাউড়ির বড় ছেলে আর গ্রামপ্রধানের ছেলে নিশুম্ভকে।
বুকের ভিতরে একটা চাপা ভয় কাজ করলেও ঘাড় শক্ত করে দাঁড়ায় সাঁঝলি।

-সিদিন বড় অপমানটো করছিলি বটে? তুর রূপের গুণের অহংকারটো আজ ভেইঙ্গে যদি না দিছি তো আমরা এক বাপের ব্যাটাটো লাই আছি!

-এক বাপের ব্যাটা আছিস বুঝলাম, কিন্তু কুত ব্যাটার বাপ আছিস সিটা বুল দিকি ক্যানে? সিটো যিদিন হাটে হাঁড়িটো ভেইঙ্গে দিবো সিদিন বুইঝতে পারবিক।

মনের জোর, গলার জোর ভগবান মেয়ে মানুষকে দিলেও গায়ের জোরটা অকারণেই কেন যে কম দিয়েছেন সেটা তিনিই জানেন।

পলাশবনির শাল সেগুনের লাল মাটি সেদিন আরও লাল হয়ে ওঠে সাঁঝলির রক্তে।

ক্লান্ত শ্রান্ত দুর্দম অসুর দ্বয় তখন মদের নেশায় নিজেদের প্রস্তুত করতে ব্যস্ত পরবর্তী অধ্যায় জয় করার জন্য।
কিছুটা ধাতস্থ হয়ে সাঁঝলি টলতে টলতে উঠে দাঁড়ায়।
জ্যামিতি বাক্স থেকে কম্পাসটা নিয়ে, শক্ত করে ধরে ডান হাতের মুঠোয়।
নিঃশব্দে এসে দাঁড়ায় নিশুম্ভের পিছনে...

ধুমাবতীর মতো খোলা, বিধ্বস্ত একমাথা কালো কোঁকরা চুল নিয়ে কালরাত্রির অশনি সংকেত।
এক লাথিতে নিশুম্ভকে মাটিতে ফেলে ওর বুকের উপর বসে সাঁঝলি। কম্পাসের কাঁটাটা দিয়ে গলার নলির উপর আঘাতের পর আঘাত করতে থাকে ও। ফিনকি দিয়ে ওঠে রক্তের স্রোত। শ্যামল বাউড়ির বড় ছেলে এই দৃশ্য দেখে ছুটে পালায়।

রক্তে ভেজা পোশাক... দুহাতে, চোখে মুখে রক্ত... খোলা চুল...
এমন চেহারা দেখে ফুলমনি আঁতকে ওঠে। সাঁঝলির মুখে সব কথা শুনে কিছুক্ষন চুপ করে কি যেন ভাবে ফুলমনি। সাঁঝলির বাপ তখন হয়তো কোথাও মদের নেশায় ঝিম মেরে পড়ে আছে।


ভোর তিনটের প্রথম ট্রেনটা যখন শহরের পথে, সাঁঝলিদের দরমার ঘরটা তখনও দাউদাউ করে জ্বলছিল...

কালরাত্রির চোখে তখন শহরের স্বপ্ন।
মায়ের কাঁধে মাথা রেখে ট্রেনের ঝিকঝিক শব্দ তখন মহুয়ার নেশায় মেশা মাদলের তালের থেকেও যেন বেশি নেশা ধরিয়েছে...


©দলছুট পাখি
@champa sarder

Comments

Popular posts from this blog

বোকা দিবসের শুভেচ্ছা - Champa Sader

চালাকি করেই জীবন গেল চালাকি করেই চলছো বেশ চালাকি দিয়েই আগামী যাবে রোজনামচায় দশের দেশ। আমিই কেবল বোকার হদ্দ বোকামিতেই দিন কাটাই, স্বপ্ন দেখেই হাসছি কেবল তারা গুনে রাত ছাটাই। চালাকিটা থাক তোমাদের এদিক সেদিক কথার ভাঁজ, সময় বদল মুখোশ পরে সুযোগ বুঝে বদল সাজ। বোকার মতো হয়েছি খুশি বোকার মতো দিয়েছি তাল, কেন যেন আজও বুঝিনা কোনটা মেকি কোনটা জাল! চালাকি থাক রক্তে তোমার বিজয়ী হও জীবন খেলায়, বোকা হয়েই থাকবো আমি দেখা হবে ভবের মেলায়।

সমকাল কোলাজ ( তৃতীয় সংখ্যা )

  সম্পূর্ণ ম্যাগাজিনটি পড়তে ক্লিক করুন নিচের লিঙ্কে -  সমকাল কোলাজ এপ্রিল সংখ্যা ২০২১

বিষয় - পুজোর প্রেম। গল্প - অল্প প্রেমের গল্প , কলমে - চম্পা সর্দার

জয়াদেবী ফোনটা হাতে নিয়ে উদাস হয়ে বসে ছিলেন বারান্দায়। মনে পড়ছিল- সাগর, ঝিনুক তখন কত ছোট... মা, এবার কিন্তু আমাকে পুজোতে একটা পুলিশের ড্রেস কিনে দেবে, আর একটা বন্দুক। দশ রিল ক্যাপ চাই আমার। রোজ রোদে দেবো, দেখবে কেমন ফাটে। নাড়ু বানানোর জন্য নারকেলে পাক দিতে দিতে জয়া বলে- সাগরের চাহিদা তো শুনলাম এবার তোর কি চাই ঝিনুক? আমার একটা গোলাপি রঙের ফেয়ারি ড্রেস। গোলাপি হেয়ারব্যান্ডও চাই, তিনটে ফুল লাগানো। তা তোমার কি চাই জয়া? বাজারের ব্যাগটা রান্না ঘরের এক কোণে নামিয়ে রাখেন সুব্রত বাবু। আরে, আরে তোমার কি কোনো দিন বুদ্ধি হবে না! একশো দিন বলেছি, বাজার করে ব্যাগ রান্না ঘরে ঢোকাবে না! চেঁচিয়ে ওঠে জয়া। দেখলি সাগর, দেখলি ঝিনুক তোদের মা কেমন সারাক্ষন আমায় বকতে থাকে। তোদের সাথে সাথে আমারও নিস্তার নেই তোদের মায়ের কাছ থেকে। সেবারের পুজোতে ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে ছবি তোলা হয়েছিল স্টুডিওতে। একটা ছবিতে পুলিশের ড্রেস পরে সাগর আর পরীর মতো সাজে ঝিনুক। আর একটা ছবিতে জয়া, সুব্রতর সাথে সাগর, ঝিনুক। ফ্যামিলি ফটো। ফোন গ্যালারিতে ছবিগুলো দেখতে দেখতে চোখটা ঝাপসা হয়ে আসে ষাটোর্ধ্ব জয়ার। এলবাম থেকে ফোনে ছবি ত...