- এ্যাই বনি শোন শোন….
দুর্গা পূজো সামনে। বনানী সাজের জিনিস কিনতে দোকানের দিকে। হাঁকডাকে দাঁড়িয়ে পড়লো।
রবিবার। ঠেকে ছেলেদের আড্ডা চলছে। নাড়ু, রবি, কৌশিক পাড়ারই ছেলে সব।
- কিরে এই সকালে কই যাস?
বনানী মুখ কুঁচকে বললো - সে খবরে তোমার কি রবিদা?
রবি মনে মনে বনানীকে ভালোবাসে।
- একা যাস, যদি কুকুরে তাড়া করে!
- কেন, আমি কি চোর?
পাশ থেকে কৌশিক বলে উঠলো, মাইরি তুই চোর হতে যাবি কেন! তুই হলি গিয়ে আমাদের গুরুর বোন। তোকে রক্ষা করা কর্তব্য।
- দাদা কি তোমাদের দায়িত্ব দিয়েছে?
নাড়ু তোতলা। উত্তেজিত হলে কথা আরো জড়িয়ে যায়। শব্দগুলো তখন ভয়ানক আকার নেয়।
- এ্যাই বববড়দের সসসসঙ্ গে সম্...সম্ মানে.....ক...ক....ক
বনির ধৈর্য্য কম। সে তার পথ ধরলো।
বাড়া ভাতে ছাই পড়তেই রবি ক্ষেপে লাল - শালা, তোকে কে কথা কইতে বলেছে? কৌশিক সবে লাইনে ফেলছিল। ধুস্...
এমনক্ষণে মধুবন আর বিমানের আগমন।
- কি হয়েছেরে? বিমান প্রশ্ন তুলল।
রবি ব্যাজার মুখে বললো - বনিকে একটু লাইন মারছিলাম। নাড়ু মাকড়া কেঁচিয়ে দিল। প্লিজ একটু ব্যবস্থা করে দেনা বস্। মাইরি তোর বোনটা এতো ত্যারা, বাগে আনতেই পাচ্ছি না!
- হ্যাঁ গুরু তুমি চাইলেই হয়, কৌশিক রবির হয়ে ওকালতি করলো।
বিমান হাত উল্টে বলল, উপায় নেই। ওর নজর অন্যদিকে।
রবি কঁকিয়ে উঠল - সে কে? আমি বাঁচবনা।
- সেটা আমাকে নয়, মধুবনকে বল।
- মানে?
- বনি মধুবনকে পছন্দ করে।
মধুবন মৈত্র। ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে এক বড় কোম্পানিতে কর্মরত। চেহারাটাও বেশ। মেয়েরা মধুবনকে দেখলেই প্রেমে পড়ে যায়। বনানীও ব্যতিক্রম নয়। রবি কাঁদোকাঁদো মুখে মধুবনের পায়ের কাছে বসে বলল - তুই আমার বন্ধু না শত্রু?
মধুবন সান্ত্বনা দিল - বিমানটা তোর সঙ্গে মজা করছে। চিন্তা নিসনা, বনির সঙ্গে ফিট্ করে দেবো। এই পূজোতেই প্রেম জমে উঠবে।
নাড়ু রবির ধমক খেয়ে চুপ ছিলো। এবার দু’হাত তুলে আনন্দ ধ্বনি - হুহুহুর রে.....
ছুটির দিনেই আড্ডাটা জমে। বাকি দিনে অফিসের ব্যস্ততা। তবে পূজো সামনে। তাই ছুটির দিনেও ক্লাবের পূজো নিয়ে ব্যস্ত সবাই আর তার ফাঁকে একটু আড্ডা।
স্যাকরাপাড়া’র দুর্গাপূজো মোটামুটি জাঁকিয়ে হয়। এখানে অবস্থাপন্ন মানুষের বাস বেশি। চাঁদাও ওঠে ভালোই। বিমানের দল ক্লাবের দুর্গাপূজোয় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে।
পূজো দোরগোড়ায়। এখনো রবি বনানীর নাগাল পেলো না। চারবেলা মধুবনের পেছনে লেগে আছে। মধুবন রেহাই পেতে বনানীকে ধরলো একদিন। বনানী ছাদে কাপড় মেলতে এসেছে। মধুবন আর বিমানদের বাড়ি পাশাপাশি। ছাদে ছাদে কাছাকাছি। মধুবন হাঁক পাড়ল - এই বনি...
বনানী মধুবনকে আগেই দেখেছে। ঘরের জানলা দিয়ে তাকে দেখেই কাপড় মেলার অছিলায় ছাদে আগমন।
- বলো
- পূজোয় একাই ঘুরবি ঠিক করলি?
- কে আছে আমার, সঙ্গ দেবে? বনানীর বাঁকা উত্তর।
- রবি তোকে ভালোবাসে।
- আর তুমি?
- তোর জন্য একটা শাড়ি কিনেছি ভাইফোঁটায় দেবো বলে।
বনানীর মুখ নিমেষে অন্ধকার। করুণমুখে বলে উঠলো - মধুবনদা তুমি বড় নিষ্ঠুর!
- রবির ফোন নাম্বারটা বিমানের কাছ থেকে নিয়ে নিস। রবি তোকে খুব ভালোবাসে। ওকে দুঃখ দিস না।
বনানী মধুবনের প্রত্যাখানে মনে আঘাত পেলেও দিনের সাথে সামলে নিয়েছে। মধুবনের মধ্যস্থতায় বনানী রবির প্রতি সদয় হয়েছে। পূজোতে রবি-বনানীর প্রেম জমে উঠবে। নাড়ুর মনে ভারী কষ্ট, এখনো কেউ এলোনা জীবনে। একবার সুযোগ এসেও ছিলো কিন্তু ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’ কথাটা বলতে এতটাই সময় নিয়েছিল, মেয়েটি ধৈর্য্য হারিয়ে চলে যায়। বিমান প্রেমের চক্করে নেই। অফিস আর বাকি সময়ে ক্লাবে উৎসর্গ প্রাণ। কৌশিকের প্রেমিকা স্কুল শিক্ষিকা তবে বয়সে বড়। কৌশিক ভবিষ্যতটা বোঝে ভালো। মধুবন বেরসিক, প্রেম বোঝেনা; বন্ধুদের কথা তাই।
অবশেষে পূজোর ঢাক বেজে উঠলো মণ্ডপে। আজ পঞ্চমী। বনানীর মামার মেয়ে এসেছে মুম্বাই থেকে। কলকাতার পূজো তার কাছে এই প্রথম। বনানীর বয়সী। বনানী খুশি, এবারের পূজোয় জমবে মজা।
বেলা সরে পঞ্চমীর সন্ধ্যে নামতেই ঢাক-কাঁসর ধ্বনিতে চারদিক মুখর হয়ে উঠলো। দুর্গা পূজো মানেই নতুন পোষাক, ঠাকুর দেখা, ভালো খাবার, প্রেমে ভাসা।
সারাদিন ধরে বনানী ব্যস্ত ছিল রূপচর্চায়। সন্ধ্যেবেলায় মামার মেয়েকে নিয়ে মণ্ডপে এলো।
বনানীর সঙ্গে নতুন মুখ দেখেই কৌশিকের চোখ বড় বড় - নতুন দেখছি! কেরে বনি?
- মামার মেয়ে
- নাম’তো আছে
- মৃত্তিকা
মধুবন পাশেই ছিল। বলে উঠলো - খুকির এমন ভারি নাম?
মৃত্তিকা নতুন পরিবেশে এসেও সংকোচে নেই। চটপট বুলি তার -খোকার নামটা কি হালকাতে আছে?
মধুবনের চোখে দুষ্টুমির ছোঁয়া। মৃত্তিকার আপাদমস্তক চোখ বুলিয়ে বলল - বেলে মাটি। ফণিমনসার চাষটাই হবে ভালো। ভাবছি পূজোর চারদিন সব কাজ ফেলে টবে মাটি ভরবো আর গাছ লাগাবো।
বনানী খেপে উঠলো - মধুবনদা মেয়েদের একটু সন্মান দিতে শেখো।
কৌশিকও রেগে বললো - সত্যি মধুবন তুই একটা যা-তা!
মধুবন হাসতে লাগলো।
বনানী শাসিয়ে রাখলো মধুবনকে, দাদাকে দিয়ে একহাত নেবে। ধোপার ধোলাই কাকে বলে বুঝিয়ে দেবে।
মৃত্তিকা আবার মধুবনের মুখোমুখি সপ্তমীর ভোরে।
শরতে ভোরের বাতাসে শিউলির গন্ধ মেশে, সেইসাথে পূজোর আমেজ। মৃত্তিকার ঘুম ভেঙে যেতে বিছানাতে পড়ে থাকতে ভালো লাগলোনা। ছাদে চলে এলো।
মধুবন ভোরে উঠে রোজকার মতো সোজা ছাদে। দেখা হয়ে গেল দুজনের।
- ইস্ ভোরবেলাতেই মাটি দর্শন! সারাদিনই সব মাটি!
- মাটিই খাঁটি। মৃত্তিকার চোখা উত্তর।
- তাই বুঝি? তাহলে আমার মাটি চাই।
মৃত্তিকা ছাদে রাখা টবের মাটি খুঁচে মধুবনের দিকে ছুঁড়তে লাগলো।
- এই কি হচ্ছে? মধুবন লাফিয়ে উঠলো।
- আহা মাটি চাইলেন তো।
- এর শোধ তুলবো।
হুমকিতে মৃত্তিকা ঘাবড়ালো না। সোজা প্রশ্ন - কিভাবে শুনি?
- সপ্তমীর সন্ধ্যা কাটাতে চাই তোমার সঙ্গে। ছাদে এসো সন্ধ্যায়।
সপ্তমীর সন্ধ্যায় সকলে ঠাকুর দেখতে বেরোলেও মৃত্তিকা মাথাধরার অজুহাতে বাড়ি রয়ে গেল। মধুবনও কোনো অজুহাতে বন্ধুদের এড়ালো।
এখন মধুবন আর মৃত্তিকা দু’ছাদে দু’জনে মুখোমুখি।
- মৃত্তিকা, ঠাকুর দেখতে যেতেই পারতে।
- যেতেই পারতাম। আপনি দুঃখ পেতেন।
মধুবন হেসে উঠলো।
- বারে হাসছেন?
- না এমনি। কিন্তু এমনদিনে আঁধারে দাঁড়িয়ে শুধু কথা! ভালো লাগবে তোমার?
- একদম না
- ফুচকা খেতে যাবে?
- ইস্
- কি?
- বেরসিক
- কেন?
- কিছুনা। আমি যাই। মৃত্তিকা সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালো।
- মৃত্তিকা শোনো
মৃত্তিকা অভিমানে। তাই পা থামলো না।
- এমন দিনে চল যাই ভিড় ছেড়ে কোথাও? যাবে তুমি?
মৃত্তিকা যেন শুনতে পেলোনা।
- আমি তোমাকে চাই। এই প্রথম মন প্রেম খোঁজে। সপ্তমীর সন্ধ্যারাতে তুমি-আমি কোনো নিরালায়। যাবে তুমি?
মৃত্তিকা সিঁড়ির কাছাকাছি...
- বলে যাও কিছু
এবার মৃত্তিকা ফিরলো। আবার দু’জনে মুখোমুখি।
- নির্দয় তুমি। প্রেম খোঁজো, মন বোঝোনা। মৃত্তিকার চোখ জলেভেজা। পঞ্চমীর রাতে মণ্ডপে তোমাকে দেখেই ঐ চোখে লিখেছিলাম আমার সর্বনাশ, সেদিনই। নয়তো মৃত্তিকার মন ছোঁয় কার সাধ্য! খোলা আকাশের নীচ ধরে অনেকটা পথ ‘তুমি আমি’, যাবো মধুবন।
সপ্তমী ছেড়ে নবমী। দুটো মন আজ বড়ো কাছাকাছি। চুপিসারে। পূজো মণ্ডপে মৃত্তিকা মধুবন পরস্পরকে চিনতে পারেনা। আর রাতে ছাদে সকলের আড়ালে দুই মন এক হয়ে যায়। বনানী নিজের প্রেমের খেয়ালে আছে। নজর নেই মৃত্তিকায়।
কাল দশমী। পরশু মৃত্তিকার ফেরার পালা। নবমীর রাতে ছাদে দেখা হোলো দুজনের। মৃত্তিকার মন ভারী।
- মধুবন এবারতো ভুলবে আমায়
- মাটিই খাঁটি। জীবনে খাঁটি জিনিসটাই তুলে নিতে হয়
- একতাল সোনা যদি সামনে পাও, তখন?
- বেরসিক আমি। সোনাতে নজর নেই
- পূজোর মাঝে এইটুকু সময় পেলাম। তোমাকে কাছে পাওয়াই হোলোনা।
মধুবন ভালোমানুষের মতো মুখ করে বললো - কত কাছে চাও? যদি বলো আমার শরীরে তোমায় মিশিয়ে নিতে পারি। সময়তো যায়নি এখনো।
মৃত্তিকার কথাটা বুঝতে কয়েক সেকেন্ড লাগলো। বুঝে উঠতেই গালাগালির ফোয়ারা ছুটলো- অসভ্য, পাজি, হনুমান, উচ্চিংড়ে, বেল্লিক ছাড়বোনা তোমায়।
বনানীর পূজোর প্রেম জমেছিল বেশ। খুব খুশি সে রবিকে পেয়ে। দাদাকে বলেই ফেলেছে, বেরসিক মধুবন মিত্তিরের থেকে রবি অনেক ভালো। আফশোস এটাই, খামোখা এতদিন সময় নষ্ট করলো।
দশমী কেটে আজ একাদশী। বিকেলে মৃত্তিকা রওনা দিল এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে। বিমান তাকে এয়ারপোর্ট পৌঁছে দিতে সঙ্গে। মৃত্তিকা আশায় ছিলো, বিদায়বেলায় মধুবনের সঙ্গে একবার কথা হবে। হোলোনা। নবমীর রাতেই শেষ কথা। দশমীতে সারাদিন শুধু চোখেই দেখা, কথা এতটুকু নয়। আজ মধুবন অফিসে।
এয়ারপোর্ট পোঁছেই মৃত্তিকার আনন্দে মন। মধুবন দাঁড়িয়ে একগোছা গোলাপ হাতে।
বিমান হা - তুই...ই...
মধুবন হালকা হেসে - চলে এলাম।
- তোর অফিস?
- ভাঁড়ে দিয়েছি।
মধুবন মৃত্তিকার হাতে গোলাপগুচ্ছ দিয়ে বললো - সাবধানে যেও।
মৃত্তিকা ভুলে গেলো তার মামাতো দাদা পাশেই। মধুবনকে দু’বাহুতে জড়িয়ে বুকে মাথা রেখে কেঁদে ফেলল।
- এই পাগলি, কান্না কিসের? খুব শিগগিরই মা-বাবা যাচ্ছেন তোমার কাছে। সামনের পূজোয় প্রেম জমবে ছাদে নয়, ঘরের মাঝে।
বিমান হা করে একবার মধুবনের দিকে একবার মৃত্তিকার দিকে তাকাচ্ছে। কোথা থেকে কি হচ্ছে.......
ফেরার পথে বিমান মধুবনকে জিজ্ঞাসা করলো - হোলো কবে?
- পূজোয় ছাদে
- সাংঘাতিক তুই! কেউ জানলো না মাইরি
- এখনো কারো জানার দরকার নেই।
- আমিতো জানলাম
মধুবন মুচকি হাসিতে বলল - ‘আপনি কিছু জানেননা মাস্টারমশাই..’
দুর্গা পূজো সামনে। বনানী সাজের জিনিস কিনতে দোকানের দিকে। হাঁকডাকে দাঁড়িয়ে পড়লো।
রবিবার। ঠেকে ছেলেদের আড্ডা চলছে। নাড়ু, রবি, কৌশিক পাড়ারই ছেলে সব।
- কিরে এই সকালে কই যাস?
বনানী মুখ কুঁচকে বললো - সে খবরে তোমার কি রবিদা?
রবি মনে মনে বনানীকে ভালোবাসে।
- একা যাস, যদি কুকুরে তাড়া করে!
- কেন, আমি কি চোর?
পাশ থেকে কৌশিক বলে উঠলো, মাইরি তুই চোর হতে যাবি কেন! তুই হলি গিয়ে আমাদের গুরুর বোন। তোকে রক্ষা করা কর্তব্য।
- দাদা কি তোমাদের দায়িত্ব দিয়েছে?
নাড়ু তোতলা। উত্তেজিত হলে কথা আরো জড়িয়ে যায়। শব্দগুলো তখন ভয়ানক আকার নেয়।
- এ্যাই বববড়দের সসসসঙ্ গে সম্...সম্ মানে.....ক...ক....ক
বনির ধৈর্য্য কম। সে তার পথ ধরলো।
বাড়া ভাতে ছাই পড়তেই রবি ক্ষেপে লাল - শালা, তোকে কে কথা কইতে বলেছে? কৌশিক সবে লাইনে ফেলছিল। ধুস্...
এমনক্ষণে মধুবন আর বিমানের আগমন।
- কি হয়েছেরে? বিমান প্রশ্ন তুলল।
রবি ব্যাজার মুখে বললো - বনিকে একটু লাইন মারছিলাম। নাড়ু মাকড়া কেঁচিয়ে দিল। প্লিজ একটু ব্যবস্থা করে দেনা বস্। মাইরি তোর বোনটা এতো ত্যারা, বাগে আনতেই পাচ্ছি না!
- হ্যাঁ গুরু তুমি চাইলেই হয়, কৌশিক রবির হয়ে ওকালতি করলো।
বিমান হাত উল্টে বলল, উপায় নেই। ওর নজর অন্যদিকে।
রবি কঁকিয়ে উঠল - সে কে? আমি বাঁচবনা।
- সেটা আমাকে নয়, মধুবনকে বল।
- মানে?
- বনি মধুবনকে পছন্দ করে।
মধুবন মৈত্র। ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে এক বড় কোম্পানিতে কর্মরত। চেহারাটাও বেশ। মেয়েরা মধুবনকে দেখলেই প্রেমে পড়ে যায়। বনানীও ব্যতিক্রম নয়। রবি কাঁদোকাঁদো মুখে মধুবনের পায়ের কাছে বসে বলল - তুই আমার বন্ধু না শত্রু?
মধুবন সান্ত্বনা দিল - বিমানটা তোর সঙ্গে মজা করছে। চিন্তা নিসনা, বনির সঙ্গে ফিট্ করে দেবো। এই পূজোতেই প্রেম জমে উঠবে।
নাড়ু রবির ধমক খেয়ে চুপ ছিলো। এবার দু’হাত তুলে আনন্দ ধ্বনি - হুহুহুর রে.....
ছুটির দিনেই আড্ডাটা জমে। বাকি দিনে অফিসের ব্যস্ততা। তবে পূজো সামনে। তাই ছুটির দিনেও ক্লাবের পূজো নিয়ে ব্যস্ত সবাই আর তার ফাঁকে একটু আড্ডা।
স্যাকরাপাড়া’র দুর্গাপূজো মোটামুটি জাঁকিয়ে হয়। এখানে অবস্থাপন্ন মানুষের বাস বেশি। চাঁদাও ওঠে ভালোই। বিমানের দল ক্লাবের দুর্গাপূজোয় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে।
পূজো দোরগোড়ায়। এখনো রবি বনানীর নাগাল পেলো না। চারবেলা মধুবনের পেছনে লেগে আছে। মধুবন রেহাই পেতে বনানীকে ধরলো একদিন। বনানী ছাদে কাপড় মেলতে এসেছে। মধুবন আর বিমানদের বাড়ি পাশাপাশি। ছাদে ছাদে কাছাকাছি। মধুবন হাঁক পাড়ল - এই বনি...
বনানী মধুবনকে আগেই দেখেছে। ঘরের জানলা দিয়ে তাকে দেখেই কাপড় মেলার অছিলায় ছাদে আগমন।
- বলো
- পূজোয় একাই ঘুরবি ঠিক করলি?
- কে আছে আমার, সঙ্গ দেবে? বনানীর বাঁকা উত্তর।
- রবি তোকে ভালোবাসে।
- আর তুমি?
- তোর জন্য একটা শাড়ি কিনেছি ভাইফোঁটায় দেবো বলে।
বনানীর মুখ নিমেষে অন্ধকার। করুণমুখে বলে উঠলো - মধুবনদা তুমি বড় নিষ্ঠুর!
- রবির ফোন নাম্বারটা বিমানের কাছ থেকে নিয়ে নিস। রবি তোকে খুব ভালোবাসে। ওকে দুঃখ দিস না।
বনানী মধুবনের প্রত্যাখানে মনে আঘাত পেলেও দিনের সাথে সামলে নিয়েছে। মধুবনের মধ্যস্থতায় বনানী রবির প্রতি সদয় হয়েছে। পূজোতে রবি-বনানীর প্রেম জমে উঠবে। নাড়ুর মনে ভারী কষ্ট, এখনো কেউ এলোনা জীবনে। একবার সুযোগ এসেও ছিলো কিন্তু ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’ কথাটা বলতে এতটাই সময় নিয়েছিল, মেয়েটি ধৈর্য্য হারিয়ে চলে যায়। বিমান প্রেমের চক্করে নেই। অফিস আর বাকি সময়ে ক্লাবে উৎসর্গ প্রাণ। কৌশিকের প্রেমিকা স্কুল শিক্ষিকা তবে বয়সে বড়। কৌশিক ভবিষ্যতটা বোঝে ভালো। মধুবন বেরসিক, প্রেম বোঝেনা; বন্ধুদের কথা তাই।
অবশেষে পূজোর ঢাক বেজে উঠলো মণ্ডপে। আজ পঞ্চমী। বনানীর মামার মেয়ে এসেছে মুম্বাই থেকে। কলকাতার পূজো তার কাছে এই প্রথম। বনানীর বয়সী। বনানী খুশি, এবারের পূজোয় জমবে মজা।
বেলা সরে পঞ্চমীর সন্ধ্যে নামতেই ঢাক-কাঁসর ধ্বনিতে চারদিক মুখর হয়ে উঠলো। দুর্গা পূজো মানেই নতুন পোষাক, ঠাকুর দেখা, ভালো খাবার, প্রেমে ভাসা।
সারাদিন ধরে বনানী ব্যস্ত ছিল রূপচর্চায়। সন্ধ্যেবেলায় মামার মেয়েকে নিয়ে মণ্ডপে এলো।
বনানীর সঙ্গে নতুন মুখ দেখেই কৌশিকের চোখ বড় বড় - নতুন দেখছি! কেরে বনি?
- মামার মেয়ে
- নাম’তো আছে
- মৃত্তিকা
মধুবন পাশেই ছিল। বলে উঠলো - খুকির এমন ভারি নাম?
মৃত্তিকা নতুন পরিবেশে এসেও সংকোচে নেই। চটপট বুলি তার -খোকার নামটা কি হালকাতে আছে?
মধুবনের চোখে দুষ্টুমির ছোঁয়া। মৃত্তিকার আপাদমস্তক চোখ বুলিয়ে বলল - বেলে মাটি। ফণিমনসার চাষটাই হবে ভালো। ভাবছি পূজোর চারদিন সব কাজ ফেলে টবে মাটি ভরবো আর গাছ লাগাবো।
বনানী খেপে উঠলো - মধুবনদা মেয়েদের একটু সন্মান দিতে শেখো।
কৌশিকও রেগে বললো - সত্যি মধুবন তুই একটা যা-তা!
মধুবন হাসতে লাগলো।
বনানী শাসিয়ে রাখলো মধুবনকে, দাদাকে দিয়ে একহাত নেবে। ধোপার ধোলাই কাকে বলে বুঝিয়ে দেবে।
মৃত্তিকা আবার মধুবনের মুখোমুখি সপ্তমীর ভোরে।
শরতে ভোরের বাতাসে শিউলির গন্ধ মেশে, সেইসাথে পূজোর আমেজ। মৃত্তিকার ঘুম ভেঙে যেতে বিছানাতে পড়ে থাকতে ভালো লাগলোনা। ছাদে চলে এলো।
মধুবন ভোরে উঠে রোজকার মতো সোজা ছাদে। দেখা হয়ে গেল দুজনের।
- ইস্ ভোরবেলাতেই মাটি দর্শন! সারাদিনই সব মাটি!
- মাটিই খাঁটি। মৃত্তিকার চোখা উত্তর।
- তাই বুঝি? তাহলে আমার মাটি চাই।
মৃত্তিকা ছাদে রাখা টবের মাটি খুঁচে মধুবনের দিকে ছুঁড়তে লাগলো।
- এই কি হচ্ছে? মধুবন লাফিয়ে উঠলো।
- আহা মাটি চাইলেন তো।
- এর শোধ তুলবো।
হুমকিতে মৃত্তিকা ঘাবড়ালো না। সোজা প্রশ্ন - কিভাবে শুনি?
- সপ্তমীর সন্ধ্যা কাটাতে চাই তোমার সঙ্গে। ছাদে এসো সন্ধ্যায়।
সপ্তমীর সন্ধ্যায় সকলে ঠাকুর দেখতে বেরোলেও মৃত্তিকা মাথাধরার অজুহাতে বাড়ি রয়ে গেল। মধুবনও কোনো অজুহাতে বন্ধুদের এড়ালো।
এখন মধুবন আর মৃত্তিকা দু’ছাদে দু’জনে মুখোমুখি।
- মৃত্তিকা, ঠাকুর দেখতে যেতেই পারতে।
- যেতেই পারতাম। আপনি দুঃখ পেতেন।
মধুবন হেসে উঠলো।
- বারে হাসছেন?
- না এমনি। কিন্তু এমনদিনে আঁধারে দাঁড়িয়ে শুধু কথা! ভালো লাগবে তোমার?
- একদম না
- ফুচকা খেতে যাবে?
- ইস্
- কি?
- বেরসিক
- কেন?
- কিছুনা। আমি যাই। মৃত্তিকা সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালো।
- মৃত্তিকা শোনো
মৃত্তিকা অভিমানে। তাই পা থামলো না।
- এমন দিনে চল যাই ভিড় ছেড়ে কোথাও? যাবে তুমি?
মৃত্তিকা যেন শুনতে পেলোনা।
- আমি তোমাকে চাই। এই প্রথম মন প্রেম খোঁজে। সপ্তমীর সন্ধ্যারাতে তুমি-আমি কোনো নিরালায়। যাবে তুমি?
মৃত্তিকা সিঁড়ির কাছাকাছি...
- বলে যাও কিছু
এবার মৃত্তিকা ফিরলো। আবার দু’জনে মুখোমুখি।
- নির্দয় তুমি। প্রেম খোঁজো, মন বোঝোনা। মৃত্তিকার চোখ জলেভেজা। পঞ্চমীর রাতে মণ্ডপে তোমাকে দেখেই ঐ চোখে লিখেছিলাম আমার সর্বনাশ, সেদিনই। নয়তো মৃত্তিকার মন ছোঁয় কার সাধ্য! খোলা আকাশের নীচ ধরে অনেকটা পথ ‘তুমি আমি’, যাবো মধুবন।
সপ্তমী ছেড়ে নবমী। দুটো মন আজ বড়ো কাছাকাছি। চুপিসারে। পূজো মণ্ডপে মৃত্তিকা মধুবন পরস্পরকে চিনতে পারেনা। আর রাতে ছাদে সকলের আড়ালে দুই মন এক হয়ে যায়। বনানী নিজের প্রেমের খেয়ালে আছে। নজর নেই মৃত্তিকায়।
কাল দশমী। পরশু মৃত্তিকার ফেরার পালা। নবমীর রাতে ছাদে দেখা হোলো দুজনের। মৃত্তিকার মন ভারী।
- মধুবন এবারতো ভুলবে আমায়
- মাটিই খাঁটি। জীবনে খাঁটি জিনিসটাই তুলে নিতে হয়
- একতাল সোনা যদি সামনে পাও, তখন?
- বেরসিক আমি। সোনাতে নজর নেই
- পূজোর মাঝে এইটুকু সময় পেলাম। তোমাকে কাছে পাওয়াই হোলোনা।
মধুবন ভালোমানুষের মতো মুখ করে বললো - কত কাছে চাও? যদি বলো আমার শরীরে তোমায় মিশিয়ে নিতে পারি। সময়তো যায়নি এখনো।
মৃত্তিকার কথাটা বুঝতে কয়েক সেকেন্ড লাগলো। বুঝে উঠতেই গালাগালির ফোয়ারা ছুটলো- অসভ্য, পাজি, হনুমান, উচ্চিংড়ে, বেল্লিক ছাড়বোনা তোমায়।
বনানীর পূজোর প্রেম জমেছিল বেশ। খুব খুশি সে রবিকে পেয়ে। দাদাকে বলেই ফেলেছে, বেরসিক মধুবন মিত্তিরের থেকে রবি অনেক ভালো। আফশোস এটাই, খামোখা এতদিন সময় নষ্ট করলো।
দশমী কেটে আজ একাদশী। বিকেলে মৃত্তিকা রওনা দিল এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে। বিমান তাকে এয়ারপোর্ট পৌঁছে দিতে সঙ্গে। মৃত্তিকা আশায় ছিলো, বিদায়বেলায় মধুবনের সঙ্গে একবার কথা হবে। হোলোনা। নবমীর রাতেই শেষ কথা। দশমীতে সারাদিন শুধু চোখেই দেখা, কথা এতটুকু নয়। আজ মধুবন অফিসে।
এয়ারপোর্ট পোঁছেই মৃত্তিকার আনন্দে মন। মধুবন দাঁড়িয়ে একগোছা গোলাপ হাতে।
বিমান হা - তুই...ই...
মধুবন হালকা হেসে - চলে এলাম।
- তোর অফিস?
- ভাঁড়ে দিয়েছি।
মধুবন মৃত্তিকার হাতে গোলাপগুচ্ছ দিয়ে বললো - সাবধানে যেও।
মৃত্তিকা ভুলে গেলো তার মামাতো দাদা পাশেই। মধুবনকে দু’বাহুতে জড়িয়ে বুকে মাথা রেখে কেঁদে ফেলল।
- এই পাগলি, কান্না কিসের? খুব শিগগিরই মা-বাবা যাচ্ছেন তোমার কাছে। সামনের পূজোয় প্রেম জমবে ছাদে নয়, ঘরের মাঝে।
বিমান হা করে একবার মধুবনের দিকে একবার মৃত্তিকার দিকে তাকাচ্ছে। কোথা থেকে কি হচ্ছে.......
ফেরার পথে বিমান মধুবনকে জিজ্ঞাসা করলো - হোলো কবে?
- পূজোয় ছাদে
- সাংঘাতিক তুই! কেউ জানলো না মাইরি
- এখনো কারো জানার দরকার নেই।
- আমিতো জানলাম
মধুবন মুচকি হাসিতে বলল - ‘আপনি কিছু জানেননা মাস্টারমশাই..’
Comments
Post a Comment