Skip to main content

গল্পের নাম - আনন্দি , লেখিকা- তাপসী ঘোষ (বেখেয়ালী)

Writer - Tapasi Ghosh
- ও কাকি, চোখ দিয়ে জল গড়ায় ক্যান? - মনখান কান্দেরে পরাণ - ক্যান? - নদীর কূল’খান ডাক দেতেছে। কিন্তু শরীলডায় বড় জ্ব--র। রেতে জ্বর এয়েছিলো। এহনও শরীলডায় গরম। কি করে যাই ক’দিনি? তাইতো মনখান কান্দেরে পরাণ। মন ব--ড় কান্দে। একটা তিতো হাসি দিয়ে বলল পরাণ মাঝি- নদীর কূল! ও কাকি, ভরা বর্ষা! কূলের মাটি ভাঙতেছে রোজ এট্টু করে। সরতি সরতি গ্রামের মানুষগুলোর বাস এককোণে এসে ঠেয়েছে। দেহো, ঐ’কূলও থাহে ক’দিন! জেনে রাহো কাকি আমাদের শ্যাষ ঐ নদী গব্বেই। -ও’কথা কোস নে পরাণ। ও’কথা কোসনে। -ক্যান কবনা? আমাদের জেবন’তো জেবন নয়গো। পেত্যেক বার ভোটখানের সময় নেতারা কত আশ্বাসখান দিয়ে যায়। তারপর সব ফুরুৎ। রাক্ষুসী নদী ঐ ময়ালিনীর প্যাটখানাও কত্ত বড়ো! গবগব করে খেতেছে। রোজ জলের ধাক্কায় কূল ভাঙতেছে আর ভাঙতেছে। আনন্দি রুগ্ন হাতখানা পরাণের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ধরদিনি আমায়। নিয়ে চলদিনি ঐ কূলে। দেহি কত বড় সাহসখান ঐ রাক্ষুসীর! আমার প্যাট নিল। সিঁদুরখান মুছলো। যে শাউড়ী আমায় বুক দিয়ে আগলাতো তাঁরেও খ্যালো। বাকি আমি। ‘খা আমারে’ কই ময়ালিনীকে; ‘কিন্তু গ্রাম উজাড়ের সাহসখান দেখাসনে’। রোজ ময়ালিনীর কূলে দাঁড়ায়ে এ’কথাই কই। জানিস পরাণ, জলের তলায় মোর আপনজনেরা কথা কয়! শুনতি পাই আমি। পরাণ অবাক গলায় - কও’কি কাকি! - পাইরে পরাণ পাই। কূলে দাঁড়ায়ে যহন জলের তলায় চক্ষুখানা পাতি, দেহি সহল’কে। মনের আয়নাখানা স্বচ্ছ থাকলি সব চাক্ষুষ হয়রে পরাণ। - তা ঠিক। - পরাণ তুই তো ও’ধার দিয়েই যাবি বাপ, তাইলে আমারে একটু নদীর কূলে দিয়ে যা? - কাকি তোমার শরীল ভালো না। তা সহালের খাওয়াডান কি হইছে তোমার? -খাই কি? কাল থেহে ঘরে বাড়ন্ত। কৌটারতলায় দু’মুঠ মুড়ি ছেলো। খাইছি। আর কিছু নাই। ফৈজু কয়েছিলো নড়ের পুকুর থেহে দু’গাছা করমিশাক তুলে এনি দেবে। এলোনিতো! পরাণ মর্মাহত- আমরা কি তোমার পরগো কাকি? এমন জ্বরে করমি সেদ্ধ খাবা! রক্তখান নয় বলি, পর করে দিলা কাকি?
আনন্দি একগাল হেসে- কিযে কোস্ পরাণ! এ’গাঁয়ের সব মানুষগুলানই যে আমার পরাণ। -তবে আর কথাখান না বাড়ায়ে চুপ করি শুয়ে থাহোদিনি। লক্ষ্মীর হাতে তোমার খাবারখান পাঠায়ে দেবেনে তোমার বৌমা। যাবার কালে কয়ে যাচ্ছি তারে। পরাণ উঠল। সে কোলকাতায় এক দোকানে কাজ করে। এখন সে সেই উদ্দেশ্যে রওনা দিলো। যাওয়ার আগে বাড়িতে নির্দেশ রেখে গেল যেন যথা সময়ে ঐ বৃদ্ধার কাছে ভাত পৌঁছায়।
কল্কেপুর এক ছোট্ট গ্রাম। শিক্ষার আলো তেমন করে পৌঁছায়নি এই গ্রামে। একখানা স্কুল আছে বটে। দুইজন টীচার আসেন শহর থেকে। বেনিয়মে বাঁধা তাঁরা। গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছালেও অনিয়মিত। গ্রামবাসীদের ঘরে আঁধারে আলো সেই ‘হারিকেন’। খাবার জলের সমস্যা মেটাতে টিউবওয়েল’ই ভরসা। কখনো কোনো একটা খারাপ হলে সমস্যার সৃষ্টি হয়। মানিয়ে নেয় গ্রামের মানুষগুলো। কিন্তু প্রায় প্রতিবছরের বন্যায় যখন অনেককিছু হারায়, ভেঙে পড়ে তারা। সরকার থেকে কতটুকু আর সাহায্য আসে! নিজেরাই আবার নিজেদেরকে অবলম্বন করে উঠে দাঁড়ায়। হিন্দু-মুসলমান এখানে ভাই ভাই। পরস্পরের বিপদে পরস্পর জাতকে উর্দ্ধে রেখে এগিয়ে আসে। এক ‘ভালোবাসার পৃথিবী’ এই কল্কেপুর।
আনন্দি একচিলতে বারান্দায় ছেঁড়া মাদুরেই পড়ে রইলেন। তিনকুলে কেউ নেই। বয়স সত্তর। ছিলো সবই। বন্যার জলে এক এক করে গেছে সব। তেষ্টায় আনন্দির গলা শুকিয়ে উঠছে বারে বারে। মুখ নিংড়ে ঢোক গিলে গলা ভেজাবার চেষ্টা করলেন। বৃথাই। ঘটির জলও শেষ। জল এনে গলা ভেজাবেন সেই ক্ষমতাটুকুও এই মুহূর্তে হারিয়েছেন। না খাওয়া শরীর, তার উপর জ্বর! আনন্দির চোখ দিয়ে জলের ধারা গড়িয়ে মাদুরে পড়তে লাগলো ফোঁটা ফোঁটা করে। কাঁপা হাতে আঙুলের ডগায় সেই অশ্রুজল ছুঁইয়ে নিয়ে শুকনো জিভে ঠেকাতে লাগলেন। বড়ো করুণ সে দৃশ্য!
যদি পঞ্চাশ বছর পিছিয়ে আসে সময়, তাহলে? - ‘ওরে শাঁখ বাজা, উলু দে। ষষ্ঠী নতুন বৌ নিয়ে এয়েছে যে! রাঙা টুকটুকে বৌ!’ উঠোনে একরাশ লোক। গ্রাম ঝেঁটিয়ে সব এয়োতিদের ভিড়। কচি কাচার ভিড়ও কিছু কম নয়। গ্রামের বুড়োকর্তারা সব লাঠি ভর করে এসে উপস্থিত। ষষ্ঠীপদর বৌকে আশীর্বাদ করতে হবে যে। কত আশীর্বাদ, কত ভালোবাসা দিয়ে তাঁকে বরণ করা হয়েছিলো সেদিন। শহর থেকে গ্রামে। মানাতে আনন্দির প্রথম-প্রথম কষ্টই হয়েছিল। শাশুড়ী তাঁকে বড়ই ভালোবাসতেন। শহরে স্বামীর দোকান ছিলো। আনন্দির সংসার তখন সুখে চলছে। সে ছিল এক সোনার দিন। দুবছরের মাথায় ছেলে হোলো। ভরা বর্ষা তখন। সে বছর বন্যায় নদীর কূল ছাপিয়ে বহু ঘরবাড়ি নষ্ট হয়েছিল। আনন্দির ইঁটের ঘরেও জল উঠেছিল। মাচার পরে আনন্দির ছেলে হলো। রক্ষা পেলো সন্তান। কিন্তু বারোটা বছর লালনের পর সেই সন্তান হারিয়ে গেল ভরা বর্ষায় নদীর কূল ছাপানো জলে নাইতে গিয়ে। উথাল-পাথাল মন আনন্দির তখন। ষষ্ঠীপদরও দোকানে মন উঠলো। এমন বিপদে কটা মাস না যেতেই আনন্দির শাশুড়ি ঐ নদীতে নেমে আর ফিরলেন না। আনন্দি আবার দিশেহারা। ষষ্ঠীপদ পুরোপুরি ভেঙে পড়লেন। অবহেলায় দোকান লাটে উঠলো। দুর্দিন শুরু হোলো। গ্রামের মানুষ পাশে এসে দাঁড়ালো। তাদের সহায়তায় ষষ্ঠী-আনন্দি ক্রমে ক্রমে সামলে উঠলেন। আরো কটা বছর কাটলো।
আবার এক বর্ষাকাল। ভরা বর্ষা। ভরা নদীর জল উথাল-পাথাল। কল্কেপুর গ্রামে মানুষে-মানুষে শান্তি আছে, মনে শান্তি নেই। সেই বছর বন্যার হাত থেকে রক্ষা পেলেও ভরাবর্ষায় নৌকা উল্টে ভরা নদীতে গ্রামের অনেক লোক হারিয়ে গেলো। ষষ্ঠীপদও হারিয়ে গেলেন। আনন্দি সেই থেকে একা তাঁর এই ইঁটের ঘরে। সংস্কারের অভাবে জরাজীর্ণ বাড়ি। আনন্দি স্বামীর দোকান বেঁচে কিছু অর্থ পেয়েছিলেন। ব্যাঙ্কে রেখে তারই সুদে এখন দিন চলছে। কিন্তু সামান্য অর্থ! চলে কই? কখনো আধপেটা তো কখনো পরাণ, বুধো, রহিমের দল পাশে দাঁড়ায়। বেলা এগারোটা। আনন্দি এলিয়ে মাদুরে পড়েই। শুধু চোখদুটো বার’দরজার দিকে। পরাণ বলে গেছে লক্ষ্মী আসবে খাবার নিয়ে। সজল নয়নে আনন্দি অপেক্ষায়; খাবার নয়, কেবল একবিন্দু বারির! অবশেষে লক্ষ্মীর পা পড়লো আনন্দির দুয়ারে। হাতে ভাতের থালা আর আঁচলে বাঁধা মুড়ি ও ওসুধ। - ও ঠামি তোমার জন্য ভাত এনেছিগো। লক্ষ্মী হাতের থালাটা আনন্দির সামনে রাখলো। আনন্দি কিছু বলতে চাইলেন, পারলেন না। গলা যে শুকিয়ে কাঠ। ইশারায় কিছু বোঝাতে চাইলেন, তাও পারলেন না। শরীর নিস্তেজ। লক্ষ্মী পরিস্থিতি বুঝে নিল। তাড়াতাড়ি জল এনে আনন্দিকে দিল। আনন্দি জল খেয়ে একটু সুস্থবোধ করলেন। লক্ষ্মী আনন্দিকে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসিয়ে দিয়ে খাবারের থালাটা সামনে রাখলো। আনন্দি ধীরে ধীরে খেতে লাগলেন এবার। কিন্তু প্রতি গ্রাসেই মুখ কুঁচকে উঠছে। - কি হোলোগো? - তিতকুটে খাবার যে’লো! - তা নয়গো ঠামি। জ্বরের মুখ, তিতকুটে তাই। - তাইলে আর খাবনি। - ওমা না খেলে জোর পাবা কোনখানে? খাও। আমি মুড়ি’কটা ঢেলে রাখি কৌটায়। বিকেলে খেয়েনে। নেপালখুড়োর ওসুধ এনেছি। খাবার দু’দণ্ড পরে জলের সঙ্গে ঢক করে গিলে নিয়েনে। দেখবা নিমেষে চাঙ্গা হয়ে গেছো। লক্ষ্মী কথা বলতে বলতে কাজগুলো সারতে লাগলো। আনন্দি খাওয়া সারতে সারতে লক্ষ্মী তার কাজ গুছিয়ে ফেলল। - ঠামি এবার আসি। ওসুধ ঐ গোছানো রইলো, ঠিক সময়ে খেয়ে নিয়েনে। লক্ষ্মী তার কর্তব্য সেরে বিদায় নিল। এই গাঁ’খানা ছোট বটে কিন্তু এখানের মানুষগুলোর মন ছোট নয়। আনন্দির এই একলা ঘরে নিত্য অভাব। তার উপর বয়সের ভার। তবুও নিশ্চিন্তে। গাঁয়ের মানুষ তাঁর পাশে।
বিকেলের দিকে আনন্দি কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠলেন। ফৈজু সকালে আসতে পারেনি। বাপের কাজে জমিতে ব্যস্ত ছিল। বিকেলে এলো, হাতে দু’গাছা করমিশাক। ফৈজুকে দেখে আনন্দির ফোকলা দাঁতে হাসির বাহার - বাছা এয়েছিস! চল দিকিন নদীর কূলে। ফৈজু শাকগুলো দাওয়ার একপাশে রেখে ঘোরতর আপত্তি জানিয়ে বলে উঠলো -তোমার যে জ্বর! কোথাও যেতি মানা। - ওরে জ্বর কই! নেপাল কবরেজের এক গুলিতেই সব ফুরুৎ। ফৈজু মাথা নেড়ে বলল - উঁহুঁ। আসমানখান ম্যাঘে ছাওয়া। জমিনখান বৃষ্টিতে ছ্যাৎলা। কাল রেতেও নদীপাড়ের মাটি ভেঙি তেনার গব্বে গেছে। এমন’খনে নদীধারে! মোর বাপজান জানতি পারলি আমারে কাটারি নিয়ি ধাওয়া করবেনে। ফৈজু আর দাঁড়ালো না। পাছে আনন্দি’র আবদার ঠেলতে না পারে। ভগ্ন মনে আনন্দি মাদুরেই আবার শরীর এলিয়ে দিলেন।
সন্ধ্যে সাতটা। পরাণ মাঝি উপস্থিত হোলো আনন্দির জন্য রাতের খাবার নিয়ে। বৃষ্টি এখন থেমেছে। তবে এই আঁধারেও মালুম হয় আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। হয়তো প্রস্তুতি চলছে রাতে আবার অঝোরধারায় নামবে বলে! - ও কাকি কই গেলা? পরাণ খিড়কির দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে হাঁক পাড়লো। চারদিক অন্ধকার। পরাণ দাওয়ায় উঠে এল। আনন্দিকে ঐখানেই আবিষ্কার করলো। সেইথেকে তিনি ঐখানেই পড়ে। অভিমানে মন ভরা। এখন পর্যন্ত একবারও তাঁর নদী পাড়ে যাওয়া হলোনা। - ওমা ও কাকি এহানে শুয়ে আঁধারে? বুঝছি শরীল টানেনি। হ্যারিকেনখানাও জ্বেলে উঠতি পারোনি তাই! পরাণ মাঝি খাবারের থালা একপাশে রেখে ঘরে ঢুকলো হারিকেন জ্বালাতে। একটু পরেই আলো হাতে বেরিয়ে এল ঘর থেকে। - কাকি, নেপাল কবরেজের ওসুধটা খাইছো ঠিক করি? মনে হতিছে শরীলডা এহনও জুতে আসেনি? আনন্দি ধীরে ধীরে উঠে বসলেন। - শরীল আমার যুতেই কিন্তু মন যে পোড়ে। নদীর কূলে যাওয়া হোলোনে। তোরা কেউ আমারে নিয়ি গেলিনে! পরাণ খাবার থালাটা আনন্দির সামনে রাখলো। গেলাসে জল গুছিয়ে দিলো। - মন খারাপ কোরোনি কাকি। শরীলডা তেমন জুতের হয়নি এহনো। নদীর ধারখানাও পিছলে আছে। কাল দেখবানে। নাও খেইয়ে নাও। বাদলা দিনে আবার কহন বাদলা নামে! খাওয়া হলি তোমারি ঘরে শুইয়ে তবি নিশ্চিন্তি।
আনন্দি খাবারের থালায় হাত লাগালেন। কিছুক্ষণ পর খাওয়া মিটলে পরাণ আনন্দিকে ঘরে এনে বিছানায় বসিয়ে দিলো। মশারি টানিয়ে হারিকেনটাকে একটা জুতসই জায়গায় রেখে বলল - কাকি এটা জ্বালানোই থাক। তুমি শুইয়ে পড়ো। আমি আসি গিয়ে। - পরাণ বাবা আমার, যাতিছিস? - হ্যাঁ। ক্যান একা থাকতি ডর লাগে? ঠিকআছে, রহিম ভাইরে কয়ে দিতিছি রাতখান নয় এহানে দাওয়ায় পড়ে থাকবেনে। আমারতো উপায় নাই, তাইলে তো আমিই---- - মনে বড় কষ্ট। সারাদিনি একবারও গেলেমনা ময়ালিনীর কূলে! - কাকিগো, এই রেতে যাওয়া যায়না। কাল যেয়েনে। আসবানে সহালে। - ও বাপ কাল বলি কোনো কাম ফেলি রাখতি নেই। - এই রেতে আজ আর হয়না কাকি। মন ঠাণ্ডা করি ঘুমায়ে পড়ো। ওসুধে কাম হইছে। বিশ্রাম পড়লি এক্কিবারে সুস্থ। কাল নিজিই লাঠি ভর করি যেতি পারবা। আনন্দিকে বুঝিয়ে শান্ত করে পরাণ মাঝি বিদায় নিল। মাঝরাত। বৃষ্টি মুষলধারায়। মাঝে মাঝে বিদ্যুতের চমক আর মেঘের ধমক। পরাণের ঘুম ভেঙে গেলো। একটা ডাক এলো উঠোনের দিক থেকে - পরাণ.... ‘আনন্দি কাকির গলা! বিস্মিত পরাণ বিছানা ছেড়ে দরজা খুলে বাইরে এল - কাকিগো তুমি? এত ঝড়জলে এইলে কি করি? পরাণ ছুটে আনন্দির কাছে যেতে গেল। কিন্তু পা আটকে রইলো ওখানেই। আনন্দির মুখে এক স্বর্গীয় হাসি - পরাণ চিন্তে করিসনে। নদী উৎলাবেনা আর। আমি যে এহন ময়ালিনীর কূলেই বাস রেখেছি। আগলে আছি তোদের। আসিরে পরাণ। - ও কাকি কি কও তুমি? প্রকৃতির এমন নাচনে ময়ালিনী যে পাগলিনি! সেহানে এহন কি কাম তোমার? যেওনি, শোনো কথাখান। ও কাকি.... পরাণ আর্তনাদ করে উঠলো।
মশারি জড়িয়ে পরাণ গোঙাচ্ছে। বাইরে বৃষ্টির ঝমঝম আওয়াজ। তবু পরাণের বৌ গোঙানির শব্দে জেগে গেল - ওমা ওমা, ও কিগো অমন করতিছো কেনো?
পরাণ স্ত্রীর হাঁক ডাকে হুঁশে এল। ‘স্বপ’ বুঝে মন শান্ত হোলো, কিন্তু নিচ্ছিন্ত হোলো না। ঐ বুড়ো মানুষটাকে একা ঘরে রেখে এসেছে। এই ঝড়জল! পরাণ আর ঘুমাতে পারলো না। বৃষ্টি একটু ধরার অপেক্ষায় রইলো।
বৃষ্টি সামান্য কমতেই পরাণ বড় ছেলেকে নিয়ে আনন্দির দুয়ারে উপস্থিত হোলো। কিন্তু তাঁকে কোথাও দেখতে পেলো না। পাগলের মতো পরাণ ছেলে সাথে ঐ দুর্যোগেই চারদিকে খুঁজতে লাগলো। তবুও সন্ধান পেলোনা তাঁর। অবশেষে নদীর কূলে এল। এইখানে এসে সে বুঝলো আনন্দিকাকি স্বপনে সত্যটাই জানিয়ে গেছেন, ময়ালিনীর বুকেই বাস রেখেছেন তাঁর আপনজনদের সাথে। রাত যখন সকাল হোলো গ্রামের মানুষগুলো জানলো। ভেঙে পড়লো তারা। আনন্দি যে সকলের প্রিয়, অতি আপনজন।
দিন যায়। আনন্দি এখনো সবার মাঝে। কল্কেপুর গ্রামে আর বন্যা হয় না। বর্ষায়, ঘোর বর্ষাতেও নদীর উথাল-পাথাল নেই। নৌকাডুবির ভয় কমেছে তাই। গ্রামের মানুষগুলো ভাবে কোন ভোজবাজিতে এমন শান্তিতে! তারা আলোচনায় কুল পায়না। সেই রাতে পরাণ চলে যাওয়ার পর আনন্দি ধীরে ধীরে বিছানা ছেড়ে দাওয়ায় এসে বসেন। মন তাঁর অশান্ত। সারাদিনে নদীকূলে যাওয়া হোলো না। ময়ালিনীর সঙ্গে কথা কওয়া হোলোনা। স্বামী-শাশুড়ীকে প্রণাম করা হোলো না। সন্তান, তাকেও দেখা হোলোনা। আনন্দি যে তাদের দেখতে পান জলের তলে। ঐ যে বড় ‘কাতলা’ তিনটে ও’তো তাঁরই আপনজনেরা। কতবার জেলেরা তাদের জালে বাঁধতে চেয়েছে। বিফল হয়েছে।
পরাণ কথা দিয়েছে সকালেই তার কাকিকে নদীর ধারে নিয়ে যাবে। কিন্তু আনন্দির মন তাতেও শান্ত নয়। দাওয়ায় বসে ছটপট করতে লাগলেন। ঘণ্টা পর ঘণ্টা পেরোলো। তবু দাওয়াতেই। অবশেষে কালের অপেক্ষায় না থেকে একাই লাঠি সম্বলে আঁধারেই পিছোল রাস্তা কোন মনের জোরে পেরিয়ে নদীকূলে উপস্থিত হলেন। বর্ষাকাল। স্বাভাবিক, বৃষ্টিভেজা দিন। আকাশ মেঘেই ঢাকা। কখনো মেঘের গুড়গুড় আওয়াজ। আনন্দি তবু আনন্দেই নদীতীরে। সারাদিনে যেন প্রথম বুকভরা শ্বাস এখানেই নিলেন।
কালের নিয়মে কাল চলে যায়। রাত এখন বারোটা। আনন্দি তবু আনন্দেই নদী তীরে বসে। প্রকৃতিও তার নিয়মে চলে। ভরা শ্রাবণ। কয়েকদিন ধরেই বৃষ্টির ধারাপাত থেকে থেকেই। বেশ কয়েক ঘণ্টার বিশ্রামের পর বৃষ্টি নামলো আবার। আনন্দি হুঁশে ফিরলেন। তাড়াতাড়ি পা সামলে লাঠিতে ভর দিয়ে এগোতে যাবেন, শারীরিক দুর্বলতা মাথা ঘুরিয়ে পিছোল মাটি পিছলে একেবারে ময়ালিনীর অতলে।
আনন্দির মৃত্যুতে পরাণ ভেঙে পড়েছিলো। কাজ সংসার সব ফেলে নদীধারে বসে কাঁদতো। তবে বর্তমানে সে অনেকটাই শান্ত। কাজের অবসরে যেটুকু সময় পায়, নদীকূলে বসে থাকে আর নদীর দিকে তাকিয়ে কার সঙ্গে কথা বলে। লোকে বলে পরাণ মাঝির মাথাটা গেছে। পরাণের বৌ হাকিম বদ্যি কতকিছু করতে চায়। পরাণ বৌকে থামায়, ‘আমি ঠিক আছি বৌ, চিন্তে করিসনে।’
পরাণ নদীধারে বসে তার আনন্দিকাকির সঙ্গে কথা বলে। অনেককথা। জলের তলে সে তার আনন্দিকাকিকে দেখতে পায়। মন বিশ্বাসে চলে। মনআয়না স্বচ্ছ থাকলে সব চাক্ষুষ হয়, আনন্দির বিশ্বাস ছিল তাই। মনের বিশ্বাসে তিনি নদীর জলে আপনজনদের খুঁজে নিতেন। আজ পরাণও ভালোবাসা আর বিশ্বাসে আপনজন আনন্দিকাকিকে খুঁজে নিয়েছে ময়ালিনীর তলে। আর দুঃখ নেই তার। আনন্দিকাকি কাছেই আছেন।

Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

বোকা দিবসের শুভেচ্ছা - Champa Sader

চালাকি করেই জীবন গেল চালাকি করেই চলছো বেশ চালাকি দিয়েই আগামী যাবে রোজনামচায় দশের দেশ। আমিই কেবল বোকার হদ্দ বোকামিতেই দিন কাটাই, স্বপ্ন দেখেই হাসছি কেবল তারা গুনে রাত ছাটাই। চালাকিটা থাক তোমাদের এদিক সেদিক কথার ভাঁজ, সময় বদল মুখোশ পরে সুযোগ বুঝে বদল সাজ। বোকার মতো হয়েছি খুশি বোকার মতো দিয়েছি তাল, কেন যেন আজও বুঝিনা কোনটা মেকি কোনটা জাল! চালাকি থাক রক্তে তোমার বিজয়ী হও জীবন খেলায়, বোকা হয়েই থাকবো আমি দেখা হবে ভবের মেলায়।

সমকাল কোলাজ ( তৃতীয় সংখ্যা )

  সম্পূর্ণ ম্যাগাজিনটি পড়তে ক্লিক করুন নিচের লিঙ্কে -  সমকাল কোলাজ এপ্রিল সংখ্যা ২০২১

বিষয় - পুজোর প্রেম। গল্প - অল্প প্রেমের গল্প , কলমে - চম্পা সর্দার

জয়াদেবী ফোনটা হাতে নিয়ে উদাস হয়ে বসে ছিলেন বারান্দায়। মনে পড়ছিল- সাগর, ঝিনুক তখন কত ছোট... মা, এবার কিন্তু আমাকে পুজোতে একটা পুলিশের ড্রেস কিনে দেবে, আর একটা বন্দুক। দশ রিল ক্যাপ চাই আমার। রোজ রোদে দেবো, দেখবে কেমন ফাটে। নাড়ু বানানোর জন্য নারকেলে পাক দিতে দিতে জয়া বলে- সাগরের চাহিদা তো শুনলাম এবার তোর কি চাই ঝিনুক? আমার একটা গোলাপি রঙের ফেয়ারি ড্রেস। গোলাপি হেয়ারব্যান্ডও চাই, তিনটে ফুল লাগানো। তা তোমার কি চাই জয়া? বাজারের ব্যাগটা রান্না ঘরের এক কোণে নামিয়ে রাখেন সুব্রত বাবু। আরে, আরে তোমার কি কোনো দিন বুদ্ধি হবে না! একশো দিন বলেছি, বাজার করে ব্যাগ রান্না ঘরে ঢোকাবে না! চেঁচিয়ে ওঠে জয়া। দেখলি সাগর, দেখলি ঝিনুক তোদের মা কেমন সারাক্ষন আমায় বকতে থাকে। তোদের সাথে সাথে আমারও নিস্তার নেই তোদের মায়ের কাছ থেকে। সেবারের পুজোতে ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে ছবি তোলা হয়েছিল স্টুডিওতে। একটা ছবিতে পুলিশের ড্রেস পরে সাগর আর পরীর মতো সাজে ঝিনুক। আর একটা ছবিতে জয়া, সুব্রতর সাথে সাগর, ঝিনুক। ফ্যামিলি ফটো। ফোন গ্যালারিতে ছবিগুলো দেখতে দেখতে চোখটা ঝাপসা হয়ে আসে ষাটোর্ধ্ব জয়ার। এলবাম থেকে ফোনে ছবি ত...