Skip to main content

ছোটগল্প - " মূল্য " by Jayanta Adhikari


WRITER - JAYANTA ADHIKARI








অবশেষে সব যন্ত্রনার অবসান হল, ভোরে , সাড়ে চারটের সময়! শেষ চার চারটে মাস ধরে বার বার হসপিটাল - ঘর - অফিস - হসপিটাল - ওষুধ - ডক্টর - নিদ্রাহীন রাত - ক্লান্ত সকাল; ওহ, আর যেন পারছিলাম না টানতে। বার বার মনে হতো, কবে শেষ হবে এই যন্ত্রনা ? কবে পাবো আবার ফিরে, নিশ্চিন্ত দিনগুলো ?
++++++++++
আট মাস আগে, রুটিন চেকআপের সময়েও কোনোকিছুই ধরা পড়েনি। সব রিপোর্ট নিয়ে যখন ডক্টরের সাথে কথা হলো, ডক্টর বলেছিলেন, "সবকিছু নর্মাল, প্রেসারটা একটু বেশির দিকে, তবে এই বয়সে এরকম একটু হতে পারে। সেটা খুব একটা চিন্তার কিছু নয়। আর আপনার বাবার রাতে মনে হয় আজকাল একটু কম ঘুম হচ্ছে, তাই না ? যদি ঘুমের খুব সমস্যা হয়, ওনাকে এই ওষুধটা দেবেন। আসলে এই সত্তরের কাছাকাছি বয়সে, রেস্টের ও তো দরকার আছে। তবে..... " বাবার দিকে তাকিয়ে ডক্টর বলেছিলেন, "সিগারেট কমাতেই হবে আপনাকে আঙ্কেল। দিনে দু প্যাকেট সিগারেট, খুব খুব খারাপ। " এর পর সব ঠিক ছিলো।
হঠাৎ দু সপ্তাহ পরে, বাবার প্রচন্ড ব্যথা শুরু হয় পেটের ভেতরে , বেশ কয়েকবার বমিও করে , সাথে বেরোয় রক্ত। তাড়াতাড়ি ভয় পেয়ে, ডক্টরের কাছে ছুটে এসেছিলাম বাবাকে নিয়ে। ধরা পড়ে বাবার ক্যান্সার - লিভার ক্যান্সার। আর তাও একদম শেষ স্টেজে !
ডক্টররা কোনো আশা দিতে পারেন নি ! বলেই দিয়েছিলেন ওনারা ,কষ্টেসৃষ্টে হয়তো আর কয়েকটা মাস।
বাবাও কেমন যেন মেনে নিয়েছিল ভবিতব্যকে।
শেষের দিকে কয়েকটা সপ্তাহ কিরকম চুপ হয়ে গিয়েছিলো। আমার যে বাবা, সারাক্ষন ঘর দাপিয়ে বেড়াতো, পাড়ার প্রত্যেকের ভালোমন্দে পাশে গিয়ে দাঁড়াতো, সোনাইকে কাঁধে করে নিয়ে, সাইকেল এ বসিয়ে বাজারে চলে যেত ঘরের প্রয়োজনীয় - অপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনে আনতে, মাঝে মাঝে বাগানে ফুল বা গাছের পরিচর্যা করতে করতে ধোঁয়া ছাড়তো মুখ থেকে....সেই বাবা - মাত্র কয়েক মাসেই কিরকম শুকিয়ে গিয়েছিলো।
প্রায় ছয় ফুটের লম্বা শরীরটা দুমড়ে মুচড়ে ছোট্ট হয়ে গিয়েছিলো। তিনবার কেমো দিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো বাবাকে। কি বীভৎস সেই অভিজ্ঞতা। যে শিরা গুলো দিয়ে কেমোর ওষুধ যেতো, গিয়ে লিভারের ছড়িয়ে পড়া টিউমর কে ধ্বংস করতে যেতো, সেই শিরা গুলো শরীরের ভেতর থেকে পুড়ে যেতো। বাবা, ভীষণ ব্যাথায় চেঁচিয়ে উঠতো। সহ্য করতে পারতাম না সেই কষ্ট , দেখতে পারতাম না বাবাকে - আমার ছোট বেলার হীরো কে চোখের সামনে এইভাবে শেষ হয়ে যেতে।
বাবার হাঁটতে কষ্ট হতো, কিছু খেতে পারতো না, মাঝে মাঝে বমি করতো, বেরিয়ে আসতো রক্ত তার সাথে। শেষের কিছু সপ্তাহ, প্রায় বাচ্চাদের মতো কোনোরকমে হামা দিয়ে এঘর ওঘর করতো আমার বাবা। বুঝতে পারছিলাম, প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছে শরীরে, তবুও মুখে হাসি রাখার চেষ্টা করতো বাবা, আমাদের দেখলেই হেসে ওঠার ব্যর্থ চেষ্টা করতো। আমরা পাশে গিয়ে বসলে, ফিসফিস করে কত কথা বলতে চেষ্টা করতো আমার বাবা। বেশির ভাগ-ই পুরোনোদিনের সব কথা - চিন্তা করছিস কেন ? আমি ঠিক ভালো হয়ে যাবো , আবার নিজের পায়ে উঠে দাঁড়াবো , সোনাইকে কোলে নিয়ে খেলবো।
মনে মনে জানতাম, শেষের সে দিন এগিয়ে আসছে, তাই হয়তো পুরোনো দিনের কথাগুলো আরো বেশি বেশি করে.....
খুব কষ্ট হতো, কষ্ট হতো আমার, রুহীর ! রাতের পর রাত জেগে কেঁদেছি, রুহি কতবার আমার সাথে রাত জেগেছে, রুহীও হাউহাউ করে কেঁদেছে, দুজনে দুজনকে সামলেছি। কিন্তু আমি ভেতরে ভেতরে হারিয়ে যাচ্ছিলাম।
তার ওপর চিকিৎসার এতো খরচ , এই কেমো, তো কাল আবার কিছু টেস্ট, তো পরের দিন আই সি ইউ। কিভাবে যে কেটেছিলো শেষ কিছুদিন !
++++++++++
শেষকৃত্য করে, আমরা ফিরে এলাম ঘরে । রুহি , সোনাইকে নিয়ে চলে গেছে পাশের ঘরে, জানি রুহী পারবে না ঘুমোতে। সোনাই হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে , ওর পাশে শুয়ে থাকবে রুহী, বিছানা ভিজে যাবে ওর নিঃশব্দ কান্নায়।
বারান্দায় দাঁড়িয়েছিলাম আমি , দেখছিলাম, ভাবছিলাম। বাবার স্মৃতি এখনো কি পরিষ্কার, যেন চোখের সামনে কোনো সিনেমা দেখছি।
- ওই তো, ওই তো ছোট্ট আমি, বাবাকে দেখে হাত বাড়িয়ে ছুটে যাচ্ছি ; বাবা আমাকে কোলে তুলে নিলো, ছুঁড়ে দিলো আকাশের দিকে , মা আঁতকে উঠছে ভেতর থেকে, বাবা হাসতে হাসতে আমাকে ধরে ফেললো।
- ওই তো, ওই যে বাবা ফুটবল কিনে নিয়ে এসেছে, আমাকে বলে কিভাবে পা দিয়ে মারতে হয় শেখাচ্ছে , আমি একটা শটে ভেঙে ফেললাম ঘরের কাঁচ, মা রেগে তেড়ে আসছে, বাবা আমাকে বাঁচাতে, বলটা নিজের পায়ের কাছে নিয়ে চলে এসেছে।
- ওই তো, আমাকে ধরে ধরে বাবা সাইকেল চালানো শেখাচ্ছে, আমি পড়ে যাচ্ছি, বাবা ধরে নিয়েছে। আবার পড়ে গেছি, হাঁটুর কাছে কেটে গিয়েছে, বাবা রেগে আমাকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে আবার চালাতে বলছে সাইকেল , বলছে বারে বারে এইভাবেই পড়ে উঠে দাঁড়াতে হয়।
- ওই তো, মাধ্যমিকে আশি শতাংশ নম্বর নিয়ে এসেছি আমি, ভীষণ খুশি বাবা আমার, সারা পাড়াতে মিষ্টি খাওয়াচ্ছে।
- ওই তো, রুহী আর আমি বিয়ে করে এলাম বাড়িতে। বাবা আমার কানে হাত দিয়ে, কান মুলে বলছে, তুইও বড়ো হয়ে গেলি , তাই না ? রুহীকে বুকে টেনে নিয়ে বলছে, আজ থেকে তুই আমার মেয়ে।
আর পারছি না , চোখের কোণে খুব জ্বালা জ্বালা করছে। আমি উঠে এলাম, আমাদের স্টাডি রুমে। এই বিশাল তিনহাজার স্কোয়ার ফিট এর চারটে বেডরুমের ফ্ল্যাট আজ কিরকম ফাঁকা হয়ে গেছে, সবাই শান্ত, নেই বাবার ঘড়ঘড়ে - জড়িয়ে যাওয়া নিশ্বাসের আওয়াজ, নেই কাশির শব্দ।
আমি বাবার সব ফাইলগুলো বের করলাম ! শেষ আট মাসের হিসেবে করতে হবে, দেখতে হবে কত গেলো, আর কত আছে। হঠাৎ পায়ের আওয়াজে পেছনে তাকালাম। রুহি পাশে এসে বসলো। ক্লান্তির ছাপ সারা শরীরে, চোখের তলায়। রুহী পাশে এসে জিজ্ঞেস করলো , " কি করছো অনি? এসব ফাইল? কি ক্যালকুলেট করছো? চলো এখন ঘুমিয়ে পড়বে চলো, এগুলো পরেও হতে পারে ! "
আমি রুহীর দিকে না তাকিয়েই বলে উঠি, "না, না রুহি, এগুলো আমাকে এক্ষুনি করতে হবে। আমি দেখছি কত খরচ হল। তুমি ভাবতে পারো? শেষ আট মাসে প্রায় তিরিশ লাখের কাছাকাছি খরচ হয়েছে আমাদের? কেমো, ডাক্তার, টেস্ট, বাবার খাওয়া দাওয়া, ওষুধ তারপর বাবার স্পেশাল ট্রিটমেন্ট, সব কিছু নিয়ে তিরিশ লাখ? আরে এই টাকায় তো একটা ভালো ফ্ল্যাট হয়ে যেত? বা আমরা কোথাও, কোথাও বিদেশে ঘুরতে যেতে পারতাম সবাই মিলে? বা যদি ইনভেস্ট করে রেখে দিতাম? আমাদের ভবিষ্যতের জন্য? ছি ছি এতো খরচ হয়ে গেলো আমাদের? এমন একটা যুদ্ধ আমরা করলাম, যেখানে হারবো জেনেও, আমরা এতো খরচ করলাম ? কেন ? কোনো মানে হয় এসবের ? "
রুহি আর্তনাদ করে বলে উঠলো, আমাকে ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে , আমার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে , "অনি, কি বলছো তুমি? তুমি বাবার চিকিৎসাকে বাজে খরচ বলছো? এটা তো আমাদের কর্তব্য, অনি ! এই বাবা না থাকলে, আজ তোমার কোনো অস্তিত্ব থাকতো এই পৃথিবীতে? তুমি কি পাগল হলে? তিরিশ লাখ কেন, দরকার হলে, আরো বেশি খরচ করতাম আমরা। আমার সব গয়নাগাঁটি বিক্রি করে দিতাম, এই ফ্ল্যাট, সম্পত্তি সব ! একটা মানুষের জীবন এর মূল্য কি এতটাই ঠুনকো তোমার কাছে ? আর সেই মানুষটা আর কেউ নয় অনি, তোমার নিজের বাবা। তুমি একদিন আরো অনেক টাকা রোজগার করবে, আমি জানি, কিন্তু বাবার এই শরীর খারাপের সময় কত খরচ হয়েছে, কি হয়েছে, এটা কি হিসেবে করার ব্যাপার? তোমার বাবার মধ্যে, আমি নিজের বাবাকে খুঁজে পেয়েছি, সোনাই কি ভালোবাসতো ওর দাদাইকে , কত্ত বায়না, আবদার, খেলা , বেঙ্গমা- বেঙ্গমীর গল্প! কতটুকু জানো তুমি তোমার বাবাকে? ছিঃ অনি ছিঃ ; এভাবে ভাবতে হয় ? তাহলে কি তুমি আমাদেরও খাওয়ার জন্য কত খরচ হচ্ছে, সোনাইয়ের ডাক্তার, ওর প্লে গ্রূপ এর খরচ, বাস - ভ্যান - অটো - ট্রেন , এসব কিছু এভাবেই বিচার করো? আমি জানতাম না অনি, তোমার কাছে টাকাটাই সব? আর সম্পর্ক? বাবা ছেলের সম্পর্ক? "
"আমি সব বুঝতে পারছি রুহী, আমি জানি। কিন্তু রুহী ! তিরিশ লাখ টাকা ? সেটাতো জলেই গেলো, তাই না ? কোনো রিটার্ন তো পেলাম না। যেটা খরচ করলাম, তার কোনো মূল্য তো পেলাম না, সে মানুষটাও এলো না ফিরে ! "
রুহিকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় অনি, "বাবা, বাবা তো আর ফিরে আসবে না রুহী ! বাবা , বাবা, বাবাআআআআআআআআআআ ........."

Comments