আশ্বিন মাস,শরতআকাশ রূপলী মেঘে ঝলমলে।মাঝে মাঝে আবার গম্ভীর মেঘের আবির্ভাব ।মেঘেদের লুকোচুরি খেলা ।বাতাস শিউলিফুলের সৌরভে মুখরিত।কাশের বনে কাশফুল আনন্দে সম্ভাষণ জানাচ্ছে ।ক্ষেতে নবশস্য মঞ্জরী হাওয়ায় দুলছে ।চারদিকে খুশি সকলে দেবী দুর্গার আবাহনে ব্যস্ত ।প্রকৃতিও ব্যস্ত তার নানা অলঙ্কারের ডালি সাজিয়ে ।পূজোর আগমনী বার্তায় অতীতের স্মৃতি খুব মনে পড়ে যায় ।সেই গন্ধ ,কতো কথা ,কতো সাজানো স্বপ্ন সব একে একে মনের পর্দায় ভেসে আসছে ঠিক ছায়াছবির মতো ।সেই বিশেষ গন্ধ মনে করিয়ে দিল আরো অনেক কিছু !
প্রায় দুযুগ আগের কথা তখন পূজোর আনন্দ অন্যরকম অনেক বেশি বনেদিয়ানায় মোড়া ।বাড়িতে পূজা নাহলেও মহালয়ার দিন থেকেই মঙ্গল ঘট পাতা হতো ,সেই দিন থেকে চণ্ডী পাঠ শুরু হতো ঠাকুর ঘরে। পরিষ্কার পরিছন্ন বাড়ির চারপাশে ।মা উমা আসছে বাপের বাড়ি ।তাই এতো সাজসাজ রব ।নতুন পোশাক নানা খাওয়া দাওয়া ,কখনও আত্মীয় স্বজনের ভীড় পূজোর আনন্দকে একেবারে অন্য মাত্রায় নিয়ে যেতো । নতুন পোশাকের গন্ধ ,বন্ধুরা মিলে হৈচৈ আবার মাঝে মাঝে পূজো মণ্ডপে গিয়ে ঠাকুর দেখা ।ঐখানেই ঠাকুর তৈরী হতো ।মহালয়ার দিন পিতৃপুরুষের তর্পণ হতো ।বাড়ির বড়োরা ব্যস্ত থাকতো ভোর বেলায় গঙ্গায় তর্পণ কোরতে যেতো।তারপর পিতৃপক্ষের অবসান হয়ে মাতৃপক্ষের সূচনা ,দেবীর চক্ষু দান ।আমাদের কী অনাবিল আনন্দ !ঠাকুর সাজছে ।
সাধারণত পূজোর ছুটি পড়তো পঞ্চমীর দিন ।ষষ্ঠীর দিন আমরা নতুন জামা পরে দুর্গা মণ্ডপে যাওয়া ।সেদিন একটু কম সাজা ।পাড়ার দাদারা ও অন্যান্য লোকজন থাকে না পাড়ায় পূজোর সময় এসেছে একটু তাকানো ,একটু কথা বলা ,আলাপ করা সবটা মিলিয়ে একটা শিহরণ জাগানো অবস্থা ।সেই নিয়ে সারা রাত ভাবা ।পরের দিন আবার আলাপ পরিচয়ের আর এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া ।যার যাকে পছন্দ হয়েছে তাকে একটু রাগানো ।সেই রাগ অভিমান থেকে জন্মানো এক ভালোবাসার কাহিনী ।
অর্জুনদা থাকতো পন্ডিচেরীতে ।ওদের বাড়ি আমাদের পাড়ায় ।বনেদি বাড়ি । অর্জুনদা খুব সুন্দর দেখতে ,সুঠাম চেহারা খুব লম্বা ।পাড়ায় থাকতো না যেহেতু ,পাড়ার মেয়েরা খুব তাকিয়ে দেখতো ও কথা বলার জন্য মুকিয়ে থাকতো ।কিন্তু অর্জুন দা খুব কম কথা বলতো, শুধু বিশেষ ভাবে তাকিয়ে থাকতো একজনের দিকে ,সেও বুঝতো এই অমোঘ টানের কথা ।এই ভাবে সবার অলক্ষ্যে একটা সুন্দর ভালোবাসার জন্ম হোলো ।
কিন্তু অর্জুনদাতো থাকেনা আবার চলে যাবে পন্ডিচেরীতে।
সে ওরা জানে ।এর মধ্যে একটি মিষ্টি চিঠি উড় এলো লাবণ্যর হাতে ইংরেজিতে লেখা ।লাবণ্য শিহরিত ও আপ্লুত ।কিন্তু কাউকে বলা যাবে না ।লাবণ্যরা ব্রাহ্মণ আর ওরা আব্রাহ্মণ ।জানাননি হলে অচিরেই সব নষ্ট হয়ে যাবে ।খুব সাবধানে পদার্পণ করতে হবে ।
চিঠিতে লেখা ছিল একসাথে মহাঅষ্টমীর দিন দেবীর কাছে অঞ্জলী দেবে ।আরো লিখেছিল শাড়িতে আসতে ।লাবণ্যর সেই চিঠি পড়ে কী আনন্দ ! তার মাকে বললো ,সে শাড়ি পড়ে অঞ্জলি দেবে ।
পরেরদিন সুন্দর করে সেজে শাড়ি পড়ে ,তাড়াতাড়ি বন্ধুদের এড়িয়ে পূজমণ্ডপে চলে গেল ।দেখে ,অর্জুনদা সাদা পাজামা পাঞ্জাবীতে দাঁড়িয়ে আছে ওর অপেক্ষায় ।কী অপূর্ব লাগছে তাকে ,যেন সাক্ষাৎ অর্জুন !
কেউ জানলেও না এক অপূর্ব মিষ্টি ভালোবাসার জন্মের কাহিনী দেবী মাকে সাক্ষী রেখে ।শুধু চোখে চোখ রেখে আর মাঝে মাঝেই ছোট কাগজের টুকরো পরে থাকতো ।সেটা কুড়িয়ে সকলের অলক্ষ্যে টুককরে পড়ে ফেলা পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য ।তখনতো আর মুঠোফোন ছিল না ।কিন্তু কী প্রেম ঐ এক টুকরো কাগজে !
ঠাকুরের সামনে অঞ্জলি শুরু হলো ওরা ঠিক দুজনে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকলো ।হাতজোড় করে মাথা নীচু করে মন্ত্র উচ্চারণ করছে কিন্তু দুজনে দুজনের দিকে আড়ালে দেখছে ,ছোট্ট শব্দ এলো "তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে ,লাবণ্য "।ও বললো ,"আপনাকেও খুব সুন্দর লাগছে ,আর আপনার পারফিউমের গন্ধ খুব মিষ্টি ।"কারণ ঐ গন্ধে লাবণ্য পাগল হয়েছে মনে মনে ।ঐ বলিষ্ঠ চেহারায় সুন্দর মিষ্টি গন্ধে লাবণ্য একেবারে হারিয়ে ফেলেছে ।কিন্তু তখন সবকিছুতেই একটা পরিমিত ব্যপার ছিল ।বাড়ির একটা কড়া সীমানা ছিল ।
পরেরদিন মহানবমীর একফাঁকে তার অর্জুনদা তাকে একটি ঐ পারফিউম উপহার দিল ।লাবণ্য লজ্জায় লাল হয়ে গেল ।সলজ্জ হয়ে হাত থেকে হাল্কা ছোঁয়ায় পারফিউম নিলো ।ছুটে বাড়ির দিকে চলে গেল।
তার পর পূজো শেষ মন খারাপের পালা শুরু ।আর দেখা হলোনা অর্জুনদার সঙ্গে ।ও জানতে পারলো অর্জুনদা ফিরে গেছে ।কিন্তু কোনো যোগাযোগ আর করা গেল না ।লাবণ্য পড়াশোনায় মন দিল ।মাঝে মাঝে ঐ টুকরো স্মৃতি ওকে ভাবায় ।আর ও একলা ছাদে গিয়ে আকাশকে বলে ভালোবাসার কথা ,মন কেমন করা মনের কথা ।
লাবণ্য স্কুল পেড়িয়ে কলেজ ।প্রাইভেট পড়তে যাবার সঙ্গে হঠাৎ অর্জুনদার সাথে দেখা সকালে ।দুজন দুজনের দিকে তাকালো ।তারপর আবার চিঠি আসতে শুরু কোরলো ।লাবণ্য জানতে পারলো অর্জুন দা পাকাপাকি চলে এসেছে । কোনো যোগাযোগ করার উপায় নেই ।মাঝে মাঝে পারফিউমের গন্ধ নেয় ।আর ঐ কথা মনে করে ।অর্জুন দা জানায় আবার দেখা করবে ।কিন্তু লাবণ্য আর রাজি হয়নি তখন লাবণ্য আর এক ভালোবাসায় আবদ্ধ হয়েছে ।কারণ ও জানতো একই পাড়ায় এটা কোনো দিন সম্ভব নয় ।কিন্তু ঐ ভালো লাগা ও ভালোবাসা আজও লাবণ্যর মনে পড়ে ।
হঠাৎ একদিন লাবণ্য জানলো তার অর্জুন দার বিয়ে তার বন্ধুর বোনের সাথে ।ওরা এক জাতের ছিল ,তাই বিয়ে হচ্ছে ।এইটাই লাবণ্য আন্দাজ করেছিল যে ওদের সম্পর্কের পরিণতি সম্ভব নয়। খুব দুঃখ পেয়েছিল লাবণ্য ,তার প্রথম ভালোবাসা আর তার নেই ! অন্যের হয়ে গেল ।সব ফাঁকা লাগছিল ।সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো উত্তালপ হয়ে গেল তার মন । সে কাউকে বলতে পারছে না ।আর নতুন ভালোবাসাকেও মানতে পারছে না ।এই ভাবে চলে গেল কতো বছর !আজও পূজো এলে লাবণ্যর পূজোর গন্ধের সঙ্গে সেই পারফিউমের সুন্দর গন্ধ মনে পড়ে যায় ।তখনই ঐ পারফিউমের ছোট্ট বাক্স খুলে গন্ধ নিয়ে অনন্ত অতীতে ফিরে যায় ।কিছুই হয়ত নয় ,কিন্তু সদ্য যৌবনে যাওয়া এক কিশোরীর ঐ ভালোলাগা আজও নাড়িয়ে দেয় মন ।
লাবণ্যর সংসার হয়েছে ওর এক কন্যা পড়াশোনা করে ।স্বামী এক বিদ্বান মানুষ ।খুব সুখী পরিবার। তার অর্জুনদা এখন দাদু হয়ে গেছে ,তার ছেলেরো বিয়ে হয়ে গেছে । আর কোনো দিন এতো বছরে দেখা হয়নি । লাবণ্য বাপের বাড়িতে খুব কম যায় ।সময়ের সাথে সে সব প্রিয়জনদের হারিয়ে ফেলেছে । কিন্তু প্রতি বছরের মতো এবারও এখন আকাশে বাতাসে আগমনী বার্তা ধ্বনিত ।কিন্তু লাবণ্যর অনুভূতিতে সেই পারফিউমের গন্ধ ।আর একটু মন কেমন করা মন চলে যায় অতীতে !সেই সযত্নে রাখা পারফিউমের বাক্স নিয়ে নাড়াচাড়া করে ।কখনো উদাস হয়ে যায় কখনো মনে মনে হাসে ।সেদিন অঞ্জলির দিন মা দুর্গাকে কি প্রার্থনা জানিয়েছিল মনে নেই ,হাত জোড় করে দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে ছিল সবার অলক্ষ্যে ,আর বলেছিল ,"তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে ঠাকুরের মতো।"এই কথাটা এখনো লাবণ্যর কানে বাজে ।
ও বোধ হয় এখনো অঞ্জলির সময় কাউকে পাশাপাশি খোঁজে।সব ভুলে গিয়ে সেই সুন্দর গন্ধে মন বিভোর হয়ে যায় ।
-------------
©Shipra.
Comments
Post a Comment